আক্ষেপ যায়নি মহকুমার স্বীকৃতি হারানোর

শহর ঘেঁষে সেনা ছাউনি। এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট-বড় বহু মন্দির। নাম করা বড় বাজার। এ সবের জন্যই বুদবুদ-মানকর বর্ধমান জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। তবু এলাকার মানুষের আসল গর্ব তার অতীত নিয়ে। এক সময়ের মহকুমা শহর বুদবুদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পরিচিতি পায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনাছাউনি হিসেবে। ও দিকে মানকরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, এমনকী লর্ড ক্লাইভের পা পড়ার স্মৃতি।

Advertisement

সুব্রত সীট

শেষ আপডেট: ২৬ জুলাই ২০১৫ ০১:৪১
Share:

মানকরের কবিরাজ বাড়ি। ছবি: বিকাশ মশান।

শহর ঘেঁষে সেনা ছাউনি। এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট-বড় বহু মন্দির। নাম করা বড় বাজার। এ সবের জন্যই বুদবুদ-মানকর বর্ধমান জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। তবু এলাকার মানুষের আসল গর্ব তার অতীত নিয়ে।
এক সময়ের মহকুমা শহর বুদবুদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পরিচিতি পায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনাছাউনি হিসেবে। ও দিকে মানকরে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, এমনকী লর্ড ক্লাইভের পা পড়ার স্মৃতি। শুধু তাই নয়, মানকর ঠাঁই পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতেও।
বুদবুদ মহকুমা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে ১৮৪৬ সালে। বর্ধমান জেলায় তখন মহকুমা পাঁচটি— রানিগঞ্জ, বর্ধমান সদর, কাটোয়া, জাহানাবাদ ও বুদবুদ। নতুন থানাও গড়ে ওঠে বুদবুদে। আউশগ্রাম ও বাঁকুড়ার সোনামুখীও তখন ছিল এই থানার অধীনে। ১৮৮৫ পর্যন্ত জেলা পুনর্গঠনের কাজ চলে। নতুন কাঠামোয় মহকুমা হিসেবে বুদবুদের গুরুত্ব কমে। এক সময় সেই স্বীকৃতিও হাতছাড়া হয়। সে নিয়ে খানিকটা আক্ষেপ রয়েছে এলাকাবাসীর।
স্থানীয় নানা সূত্রের দাবি, সুলতানি আমলে তীর্থযাত্রীরা যাতায়াতের পথে বিশ্রাম নিতেন বুদবুদে। তখন বলা হত বুদবুদ চটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এখানে সেনাছাউনি তৈরি হয়। সেনাবাহিনীর কর্মীদের প্রয়োজনে বুদবুদে গড়ে ওঠে বাজার। সাত দশক পার করা সেই সেনা ছাউনি এখনও ইস্টার্ন কম্যান্ডের মধ্যে সব থেকে বড়। বুদবুদ বাজারের সুনাম রয়েছে এখনও। বুদবুদ সেনা ছাউনির ভেহিক্যাল ও অ্যামুনিশন ডিপো দেশের মধ্যে সব থেকে বড়। উত্তর-পূর্ব সীমান্তে চিনের সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে রাখতে এখানে বিশেষ বাহিনী গড়ার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে সেনাবাহিনী। চালু হয়েছে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগার ‘ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (ডিআরডিও)।

Advertisement

মন্দির-নগরী মানকরে গোস্বামী পাড়ার লক্ষ্মী-জনার্দন দেবের মন্দির থেকে শতাব্দী প্রাচীন রথ বেরোয় প্রতি বছর। দক্ষিণ রাইপুরের টেরাকোটার দেউলেশ্বর মন্দির, জোড়া শিব মন্দির, বুড়ো শিব মন্দির, উত্তর রাইপুরে গোকুলচাঁদ জিউয়ের মন্দির, জগন্নাথ মন্দিরের খ্যাতি রয়েছে। দক্ষিণ রাইপুরের বাসিন্দা আনন্দ গোস্বামীর দাবি, এখানে রাসলীলা করে গিয়েছেন শ্রীচৈতন্যদেব। কুয়োতলার কাছে শিবমন্দিরে টেরোকোটার কাজ রয়েছে। কথিত আছে, লালজি লাল জিউয়ের মন্দির কনৌজের ব্রাহ্মণেরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রথতলায় বাবা বণেশ্বর দেবের মন্দির, মানকেশ্বরের শিবের মন্দিরেরও খ্যাতি রয়েছে। জনশ্রুতি, মানকেশ্বরের নাম থেকেই মানকর নামের উৎপত্তি। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক মন্দিরই নষ্ট হতে বসেছে।

মানকরের ‘কবিরাজ বাড়ি’র চিকিৎসার এক সময়ে বেশ খ্যাতি ছিল। ভোলানাথ কবিরাজ, চন্দ্রশেখর কবিরাজ, বৈদ্যনাথ কবিরাজ বা পাঁচুগোপাল কবিরাজের নাম এলাকার মানুষের মুখে-মুখে ফেরে। পরিবারের সদস্য সুরজিৎ কবিরাজের দাবি, তাঁদের পরিবারের চিকিৎসার খ্যাতি এত ছড়িয়ে পড়েছিল যে রাজা রামমোহন রায় ও লর্ড ক্লাইভ তার নমুনা পেতে এসেছিলেন। তাঁর আরও দাবি, পথশ্রমে ক্লান্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও এই বাড়িতে এক বার বিশ্রাম নিয়েছিলেন। মৃণাল সেন ‘২২শে শ্রাবণ’ ছবির কিছু শ্যুটিং এখানেই সেরেছিলেন। জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, মাধবীকে সামনে থেকে দেখেছিলেন মানকরবাসী। কিছুদিন আগে একটি চ্যানেলের ধারাবাহিকের শ্যুটিংও হয়েছে এই বাড়িতে।

Advertisement

মানকরের নাম রয়েছে মিষ্টান্ন শিল্পেও। এই এলাকায় ঘরে-ঘরে তৈরি হত কদমা। কয়েক গ্রাম থেকে কয়েক কিলোগ্রাম— নানা আকারের কদমা গড়তেন মানকরের শিল্পীরা। বিয়ের সময় বর ও কনেপক্ষের মধ্যে কদমা বিনিময় চলত। পুজোতেও ব্যবহার করা হয় কদমা। এখন অবশ্য বড় কদমার কদর নেই। পেশা পাল্টে ফেলেছেন কদমা শিল্পীরাও।

১৯৩৫ সালে আশি ভরি রুপোর কাপ নিয়ে ‘মানকর ম্যাগনাম চ্যালেঞ্জ কাপ টুর্নামেন্ট’ শুরু হয়েছিল মানকরে। আড়াই ফুট উঁচু কাপের জন্য লড়াইয়ে এক কালে ‘মানকর পাবলিক গ্রাউন্ড’ মাঠে নামতেন চুনী গোস্বামী, শৈলেন মান্নারা। প্রায় ১৯৭০ পর্যন্ত নিয়মিত প্রতিযোগিতা হত। কলকাতার প্রথম ডিভিশনের বিভিন্ন ক্লাব, দুর্গাপুরের নামকরা দল, বুদবুদ সেনা ছাউনি থেকে দল আসত। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, আয়োজকের অভাব ইত্যাদি কারণে অনিয়মিত হয়ে পড়ে প্রতিযোগিতাটি। পরে পাকাপাকি ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা সুকুমার পাল বলেন, ‘‘প্রতিযোগিতার সঙ্গে মানকরের নাম জড়িয়ে আছে অঙ্গাঙ্গী ভাবে। ফের এই কাপ চালুর জন্য প্রশাসনের সাহায্য চাওয়া হয়েছে।’’

‘স্পর্শমনি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘জীবন আমার নাম, মানকরে মোর ধাম, জিলা বর্ধমানে- এত বড় ভাগ্যহত দীনহীন মোর মতো নাই কোনোখানে।’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement