জলপ্রকল্প না হওয়ায় ভরাডুবি, দাবি তৃণমূলেই

লোকসভা ভোটে আসানসোলে দলীয় প্রার্থীর হারে স্থানীয় নেতাদের অসহযোগিতা অন্যতম কারণ বলে সন্দেহ করছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। শিল্পাঞ্চলে দলের দুই বড় নেতাকে ইতমধ্যে ‘শাস্তির’ মুখেও পড়তে হয়েছে।

Advertisement

সুশান্ত বণিক

শেষ আপডেট: ২২ মে ২০১৪ ০১:১৩
Share:

প্রকল্প ফিরে গিয়েছে, পড়ে রয়েছে পাইপ।—নিজস্ব চিত্র।

লোকসভা ভোটে আসানসোলে দলীয় প্রার্থীর হারে স্থানীয় নেতাদের অসহযোগিতা অন্যতম কারণ বলে সন্দেহ করছেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। শিল্পাঞ্চলে দলের দুই বড় নেতাকে ইতমধ্যে ‘শাস্তির’ মুখেও পড়তে হয়েছে। কিন্তু এই কেন্দ্রের মধ্যে যে বিধানসভা এলাকায় সব চেয়ে বেশি ভোটে পিছিয়ে পড়েছে তৃণমূল, সেই কুলটিতে ভরাডুবির পিছনে অন্তর্কলহের চেয়েও বড় জলপ্রকল্পটি রূপায়ণ না হওয়াই বেশি দায়ী বলে ধারণা দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের অনেকে।

Advertisement

আসানসোল লোকসভা আসনে বিজেপি-র বাবুল সুপ্রিয়ের কাছে প্রায় সত্তর হাজার ভোটে হেরেছেন তৃণমূলের দোলা সেন। তার মধ্যে শুধু কুলটিতেই তৃণমূল প্রার্থী চল্লিশ হাজারের বেশি ভোটে পিছিয়ে পড়েন। রাজ্যে ভাল ফল সত্ত্বেও আসানসোলে এমন হার সহজে মেনে নিতে পারেনি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। হারের জেরে এই লোকসভা আসনের দলের তরফে দায়িত্বে থাকা তৃণমূল নেতা মলয় ঘটককে তাই মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছে। দলের জেলা (শিল্পাঞ্চল) যুব সভাপতির পদ থেকে অপসারিত হয়েছেন মলয়বাবুর ভাই অভিজিত্‌ ঘটক।

কিন্তু যে বিধানসভা এলাকা বাম আমল থেকেই তাদের দখলে, পুরসভাতেও তারাই ক্ষমতায়, সেই কুলটিতে তৃণমূল এত ভোটে পিছিয়ে পড়ল কেন? তৃণমূলের একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, নানা কারণে বছর চারেক আগে থেকেই এলাকায় দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল দলের অন্দরে। সেই ক্ষোভের আঁচ আরও বাড়ে শহরে জেএনএনইউআরএম প্রকল্পে প্রস্তাবিত বড় পানীয় জলের প্রকল্পটি ফিরে যাওয়ার পরে। ১৩৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েও শেষে রূপায়ণ করা যায়নি। পুরসভার তহবিল থেকে প্রায় ১৬ কোটি টাকায় জলের পাইপ কেনা হয়েছিল। কুলটির বিভিন্ন এলাকায় এখনও যেখানে-সেখানে সেই পাইপ পড়ে থাকতে দেখা যায়। জলপ্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হওয়া কুলটির মানুষকে হতাশ করেছে বলে তৃণমূলের বহু নেতা-কর্মী ও একাধিক কাউন্সিলর মেনে নেন।

Advertisement

কয়েক জন কাউন্সিলর ও ব্লক স্তরের কিছু নেতার দাবি, পুর কর্তৃপক্ষের দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার অভাবেই প্রকল্পটির এই হাল হয়েছে। এই খনি-শিল্পাঞ্চলের মানুষের কাছে সব থেকে বড় সমস্যা পানীয় জল। সেখানে একটি জলপ্রকল্প এ ভাবে ফিরে যাওয়ায় কুলটির বহু মানুষ লোকসভা ভোটে তাঁদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়েছেন বলে তৃণমূলের ওই স্থানীয় নেতাদের দাবি। কুলটি শহরের এক নেতার কথায়, “ভোট চাইতে গেলে সবাই শুধু জল নিয়ে জানতে চেয়েছেন।” কুলটির উপ-পুরপ্রধান বাচ্চু রায়ও বলেন, “আমারও মনে হয়, জলের সমস্যার জন্যই এ বারের ভোটে দলের এই সঙ্কট হয়েছে।”

তৃণমূলের একটি সূত্রের দাবি, লোকসভা ভোটের আগে স্থানীয় বিধায়ক তথা পুরপ্রধান উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় কার্যত হুইপ জারি করেন, যে সব কাউন্সিলরদের ওয়ার্ডে দল ‘লিড’ পাবে না, তাঁদের আগামী পুরভোটে টিকিট দেওয়া হবে না। ভোটের ফল বেরোতে দেখা গিয়েছে, ৩৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র তিনটিতে এগিয়ে তৃণমূল। পুরপ্রধান, উপ-পুরপ্রধান, প্রত্যেক চেয়ারম্যান পারিষদ, এমনকী ব্লক সভাপতির ওয়ার্ডেও বিপুল ভোটে পিছিয়ে তৃণমূল। এই অবস্থায় শিল্পাঞ্চলে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, দলের বিপর্যয়ের দায় কেন শুধু মলয়বাবুর উপরে বর্তাবে। যে সব এলাকায় তৃণমূল অনেক ভোটে পিছিয়ে পড়েছে, তাঁদের ভূমিকাও কেন আতসকাচের তলায় আনা হবে না। কুলটির এক প্রবীণ তৃণমূল সদস্যের দাবি, “দলের উচিত, এখানকার নেতৃত্বে নতুন মুখ তুলে আনা।”

তৃণমূলের একটি সূত্রে খবর, দলের উচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে কথাবার্তা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কুলটির পুরপ্রধান তথা বিধায়ক উজ্জ্বলবাবু কলকাতা গিয়েছেন। ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি শুধু বলেন, “দলীয় নেতৃত্ব আমাকে সংবাদমাধ্যমের কাছে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। আমি কিছু বলব না।” তৃণমূলের বর্ধমান জেলা (শিল্পাঞ্চল) কার্যকরী সভাপতি ভি শিবদাসন জানান, দলের বিধায়ক ও নেতাদের নিয়ে শীঘ্রই জরুরি সভা করা হবে।

সেই সভা থেকে কুলটির জন্য কী নির্দেশ আসে, সে দিকেই এখন তাকিয়ে দলের ব্লক স্তরের নেতা-কর্মীরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement