বাঁ দিকে, অঘোরনাথ পার্ক স্টেডিয়াম। ডান দিকে, কাটোয়া স্টেডিয়াম।
বছরভরের খেলাধুলো হোক বা ভোটের সভা, মাঠ-স্টেডিয়ামের প্রয়োজন সবেতেই। অথচ সেই মাঠেরই কোথাও গ্যালারি ভাঙা, কোথাও দেওয়ালে ফাটল, কোথাও আবার উঁকি মারছে আগাছা।
কাটোয়ার স্টেডিয়াম ময়দান এবং কালনার অঘোরনাথ পার্ক স্টেডিয়ামের হালও এমনই। সারা বছরই নানা প্রতিযোগিতা বা কর্মসূচীতে ব্যস্ত থাকলেও মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকমতো হয়না বলেই অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্রীড়াপ্রেমীদের।
কয়েক একর জমির উপর তৈরি এই স্টেডিয়ামটির উদ্বোধন হয় ১৯৮৮ সালের ২৮ মে। বছর খানেক পর থেকেই স্টেডিয়ামের একমাত্র গ্যালারিটি ভেঙে পড়তে থাকে। বর্তমানে স্টেডিয়ামের গায়ে বড় বড় ফাটল। উঁকি মারছে আগাছার জঙ্গল। এমনকী যে কোনও সময় গ্যালারি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও ক্রীড়াপ্রেমীদের আশঙ্কা। সেই কারণেই নির্বাচনের আগে ওই স্টেডিয়ামে মুখ্যমন্ত্রীর জনসভায় গ্যলারিতে যাতে কেউ না উঠতে পারে সে দিকে নজর রাখতে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা ছিল।
কাটোয়ার ক্রীড়ামোদীদের অভিযোগ, দিনের পর দিন স্টেডিয়াম সংস্কারের দিকে কারও নজর নেই। স্টেডিয়ামের পাঁচিল থেকে প্রধান ফটক সবই ভাঙা। এমনকী নিকাশি ব্যবস্থা এতই খারাপ যে বছরের বেশিরভাগ সময় মাঠটি জলের তলায় থাকে। ফলে মাঠে সারা বছর প্রতিযোগিতাও সেভাবে হয় না বলে তাঁদের দাবি। ওই মাঠে দীর্ঘ এক দশকের উপর ফুটবলের কোচিং ক্যাম্প চালাচ্ছেন অমর দে। তিনি বলেন, “স্টেডিয়ামের হাল ফেরানোর জন্য পুরসভা, মহকুমাশাসক, ক্রীড়ামন্ত্রীকেও চিঠি দিয়েছি। আমাদের কথায় কেউ কান দেয়নি।” এমনকী স্টেডিয়ামের ভিতর আবর্জনা ফেলে পুরসভা দূষণ ছড়াচ্ছে বলেও তাঁর অভিযোগ।
তৈরির পরে জেলাশাসকের তত্ত্বাবধানে একটি কমিটি স্টেডিয়াম দেখভালের কাজ করত। পরে জেলাশাসকের অনুমতিতে কাটোয়ার মহকুমাশাসকই স্টেডিয়াম ব্যবহারের অনুমতি দেন। গ্যালারির তলায় দুটি ঘরে মহকুমা পুলিশের ইমার্জেন্সি ফোর্স (ইএফ) রয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রতি বর্ষাতেই ছাদ দিয়ে জল পড়ে আর কাটোয়া পুরসভা অস্থায়ী ভাবে তা সংস্কার করে দেয়। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, বিগত বাম আমলে সুভাষ চক্রবর্তী ক্রীড়ামন্ত্রী থাকাকালীন স্টেডিয়াম সংস্কারে জন্য আবেদন করা হয়েছিল। পরে বর্তমান সরকারের কাছে স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য ১৩ লক্ষ টাকার একটি প্রস্তাব জমা দেয় পুরসভা। তবে রাজ্য সরকার ওই প্রকল্প ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। ক্রীড়া দফতর জানিয়েছে, ওই স্টেডিয়ামটি সরাসরি রাজ্য সরকারের নয়, ফলে কোনও অর্থ অনুমোদন করতে পারবে না তারা। তবে স্টেডিয়ামটি তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলে সংস্কার করার কথা ভাবা যেতে পারে। এরপরে কাটোয়া স্টেডিয়াম কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, ওই স্টেডিয়াম রাজ্য সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। জেলাশাসকের মাধ্যমে রাজ্য সরকারের কাছে সেই প্রস্তাবও পাঠিয়েছে তারা।
কালনার একমাত্র স্টেডিয়াম অঘোরনাথ পার্কের গ্যালারিও ভগ্নপ্রায় দশায় পড়ে রয়েছে। সম্প্রতি স্টেডিয়ামের গ্যালারির ছাদ থেকে থেকে বড় চাঙরও খসে পড়ে। তিন দশকেরও বেশি আগে কালনা শহরের মাঝামাঝি স্টেডিয়ামটি তৈরি হয়। বছরভর মহকুমা ক্রীড়া সংস্থার ফুটবল, ক্রিকেট লিগ ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের নানা দলকে নিয়ে নিয়ে একাধিক প্রতিযোগিতার আসর বসে এই স্টেডিয়ামের মাঠে। কিছু দিন আগে সিএবির অনূর্ধ্ব ১৭ লিগের কয়েকটি খেলাও অঘোরনাথ পার্ক স্টেডিয়ামের মাঠে হয়। কিন্তু সারাবছর যেভাবে মাঠ ব্যবহার হয়, রক্ষণাবেক্ষণ সেভাবে হয় না বলেই স্থানীয়দের অভিযোগ। তাঁরাই জানান, গ্যলারির নানা জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে, ভিড় বেশি হলেই লোহার কাঠামো নড়বড় করতে থাকে। ক্রীড়াপ্রেমীদের আশঙ্কা, দ্রুত সারানোর কাজ না হলে বড় ধরণের বিপদ ঘটতে পারে।
গ্যালারির ভগ্নদশার কথা স্বীকার করে নিয়েছে কালনা পুরসভাও। পুরপ্রধান তথা কালনার বিধায়ক বিশ্বজিৎ কুণ্ডু বলেন, “কয়েকমাস আগে অঘোরনাথ পার্কের জমি রাজ্যের স্পোর্টস কাউন্সিলকে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্য ক্রীড়া দফতরের পাঁচ কোটি টাকার একটি পরিকল্পনাও পাঠানো হয়েছে। তাতে খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুম, মাঠ তৈরির পাশাপাশি গ্যালারি সংস্কারের বিষয়টিও রয়েছে। পরিকল্পনা অনুমোদিত হলেই কাজ শুরু করে দেওয়া হবে।” মহকুমা ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদক অমরেন্দ্রনাথ সরকার জানান, গ্যলারির দশা সত্যিই বিপজ্জনক। তাই রাজনৈতিক দলগুলিকে ভোটের আগে মাঠ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও গ্যালারি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, “নির্বাচন মিটলেই গ্যালারির বিষয়টা নিয়ে বসব। বড় পরিকল্পনার টাকা আসতে যদি দেরিও হয়, তাহলেও অন্য খাত থেকে গ্যালারি সংস্কারের চেষ্টা করা হবে।” মহকুমাশাসক সব্যসাচী ঘোষও জানান, ভোট মিটলেই মাঠের হাল ঘুরে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।