বিধানসভা ভোটের আগে রেশন-কাণ্ডকে হাতিয়ার করে এ বার বর্ধমান জেলা জুড়ে মাঠে নামতে চলেছে সিপিএম। সেই মতো দলীয় কর্মীদের ব্লকে ব্লকে তথ্য সংগ্রহ করতেও বলা হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গ্রাম ধরে ধরে রিপোর্ট তৈরি করে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সিপিএম সূত্রে খবর। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষের আগেই রিপোর্ট দলের জেলা দফতরে পাঠাতে হবে বলে সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সিপিএমের জেলা নেতৃত্বের অভিযোগ, ‘কার্ড দেখালেই রেশন’— মুখ্যমন্ত্রী এই ঘোষণা করে দিলেও এ যাবৎ ডিজিট্যাল রেশন কার্ডের ঠিক মতো বন্টন হয়নি। দিন কয়েক আগেই কার্ড ঠিক মতো বন্টনের দাবিতে রায়না ১ ব্লক বিডিও-র কাছে স্মারকলিপি দিয়ে ফেরার পথে তৃণমূলের বোমাবাজিতে মৃত্যু হয় সিপিএম কর্মী স্বপন মালিকের।
সম্প্রতি রাজ্যের বেশ কিছু জায়গায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে ইস্তফা দিয়েছেন রেশন ডিলারের। তাঁদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর খাদ্যসাথী প্রকল্প ঘোষণা করেছেন। সেই মতো গ্রাহকেরাও লম্বা লাইন দিচ্ছেন দোকানে। কিন্তু প্রয়োজন মতো ‘ইনডেন্ট’ না আসায় গ্রাহকদের ক্ষোভের কথা আঁচ করে দোকান খুলতেই পারছেন না ডিলারদের একটা বড় অংশ। ১৭ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটালে ডিলারেরা গণ-ইস্তফা দেন। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙাতেও ১৫ জন ডিলার ইস্তফা দিয়েছিলেন। একই ছবি দেখা যায় কলকাতাতেও। টালিগঞ্জ এলাকায় এক রেশন ডিলারও ইস্তফা দিয়েছেন বলে খবর। শাসক দলের অন্দরের খবর ওই রেশন দোকানটির মালিকানা এক সময়ে ছিল তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার মায়ের নামে। বছর কয়েক আগে তিনি ডিলারশিপ ছেড়ে দিলেও তার মালিকানা গিয়েছিল দলেরই এক ঘনিষ্ঠের হাতে। সম্প্রতি আসানসোলের সালানপুর ব্লকেও ৩২ জন ডিলারের সকলেই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে ইস্তফা দেন।
সম্প্রতি সিপিএমের বর্ধমান জেলা কমিটি একটি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ‘‘রাজ্য সরকার সবুজ ও সাদা ফর্মের আবেদনের ভিত্তিতে সরকারি আধিকারিকদের পরিবর্তে অবৈধভাবে সিভিক ভলান্টিয়ার্সদের নিয়োগ করে তদন্ত করানো হয়েছে। এই কাজে তাঁদের কোনও নিয়োগপত্রই ছিল না। তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নয়, কার্যত দলীয় রাজনৈতিক দফতরে বসে খাদ্য সুরক্ষার কার্ডের সুযোগ কারা পাবে তা ঠিক করেছে।” অভিযোগ, ২৭ জানুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী ‘খাদ্যসাথী’র সূচনা করলেও, তিন সপ্তাহ কেটে গেলেও মানুষের হাতে খাদ্য সুরক্ষার সামগ্রী পৌঁছায়নি। সিপিএমের বর্ধমান জেলার সম্পাদক অচিন্ত্য মল্লিক বলেন, “খাদ্য সুরক্ষার এই কার্ড শুধু রেশন নয়, সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও কাজে লাগবে, তেমনি সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সুবিধা মেলার ক্ষেত্রেও এই কার্ড গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অথচ এই কার্ডে কোনও ঠিকানা দেওয়া নেই!” ঠিকানা-বিহীন এই কার্ড সমস্যা তৈরি করতে পারে বলেও তাঁর দাবি।
এই পরিস্থিতিতে বিধানসভা ভোটের আগে রেশন-কাণ্ডকেই আন্দোলনের হাতিয়ার করতে চাইছে সিপিএম। জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের কথায়, ‘‘নির্বাচন কমিশনের দোহাই দিয়ে শাসক দল যাতে কোনও রকম অজুহাত খাড়া করতে না পারে তার জন্যই তথ্য সংগ্রহের অভিযান চলছে।”
কী রকম ভাবে তথ্য সংগ্রহের কাজটি করা হবে? জানা গিয়েছে, কোনও সংশ্লিষ্ট গ্রামের কত জন কার্ড পাননি, আগে বিপিএল তালিকাভুক্ত থাকলেও বর্তমানে তা নেই কত জন, রেশন দোকান কত দূরে— এ রকম মূলত ন’টি বিষয়কে সামনে রেখে রিপোর্ট তৈরি করা হবে। আসলে আন্দোলনে নামার আগে মানুষের মনোভাব জরিপ করতে চাইছেন সিপিএম নেতৃত্ব। অন্তত তেমনটাই মনে করেছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। খাদ্য সুরক্ষার কার্ড না পাওয়া বা যাঁদের পাওয়ার কথা নয়, তাঁরা কার্ড পাওয়ায় মানুষের কী কী অসুবিধে হচ্ছে তাও বোঝার চেষ্টা করা হবে। শুধু তাই নয়, রেশন মিলছে না কেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত প্রধানের কাছেও যাওয়া হবে বলে সিপিএম সূত্রে খবর। আন্দোলন তৈরি করতে পারলে দু’টি লাভ দেখছেন সিপিএম নেতৃত্ব। এক, রেশন-কাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলি মানুষের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করা যাবে। দুই, মানুষকেও সংগঠিত করা সম্ভব হবে।
গোটা বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল বিধায়ক উজ্জ্বল প্রামাণিকের যদিও অভিযোগ, “২০০৬-০৭ সালে বাম আমলে রেশন-কেলেঙ্কারি ইতিহাস হয়ে গিয়েছে। সিপিএম তো মানুষের জন্য নয়, ভোটের রাজনীতি করতে চাইছে।”