ধৃতেরা কাঁথি আদালতে। (ইনসেটে) প্রভাতী সঙ্ঘের ক্লাবঘর। ছবি: সোহম গুহ।
আদালত চত্বরে একের পর এক ঢুকছে অভিযুক্তরা। একে একে ন’জন। প্রায় সকলের পরনেই নীল পাঞ্জাবী, সাদা পাজামা।
বিষয়টা কি নিতান্ত কালতালীয়?
শনিবার দুপুরে কাঁথি-৩ ব্লকের বনমালীচট্টা গ্রামে আক্রান্ত হয়েছিলেন বিডিও মহম্মদ নূর আলম। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে যে ন’জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ তাঁরা সকলেই এলাকায় তৃণমূল কর্মী বলে পরিচিত। আর এ দিন কাঁথি আদালত চত্বরে বিচারের আগে সেই অভিযুক্তদেরই দেখা গেল মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের রঙে। রবিবার ঘটনাস্থলে গিয়েও দেখা গেল অভিযুক্তরা যে ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত তার সামনে দিব্যি উড়ছে তৃণমূলের পতাকা। স্থানীয় বাসিন্দারাও জানিয়ে দিয়েছেন, ক্লাবের সদস্যরা দলের কাজেই যুক্ত। শুধু তাই নয়, এই যে নীল-সাদা পোশাকের পরিকল্পনা, তা-ও করা হয়েছে গত বছরই।
ক্লাব সদস্য মান্তু দাস ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, ‘‘এই পোশাক গত বছর থেকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে সদস্যদের জন্য। কোনও অনুষ্ঠান হলে এই পোশাকই পরা হয়। শনিবারের অনুষ্ঠানেও পাজামা-পাঞ্জাবীই পরেছিলেন সদস্যরা।’’ মান্তুর বক্তব্য এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও যোগ নেই। যদিও স্থানীয় বাসিন্দা, এমনকী অনেক ক্লাব সদস্যও গোপনে বলছেন, হঠাৎ গত বছর এই নীল-সাদা পোশাক স্থির করার পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক চাটুকারিতা। গত বছর থেকেই সরকারি অনুদানের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে তব্দির শুরু করেছেন সদস্যরা। কিন্তু তা মেলেনি এখনও। প্রক্রিয়া চলছেই। তাই এই রঙের স্তুতি।
ভোটের মুখে বিডিও নিগ্রহের বিষয়টিকে হাল্কা ভাবে নিতে পারছেন না বিরোধীরা। বিধানসভা নির্বাচনের প্রায় দু’মাস আগে থেকে শুরু হয়েছে আধা সেনার টহল। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতেও শাসক দলের আক্রমণের নিশানায় পড়ছেন বিরোধী নেতা থেকে প্রশাসনিক আধিকারিক সকলেই। সিপিএমের জেলা সম্পাদক নিরঞ্জন সিহি অভিযোগ করেছেন, “নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই উন্মত্ত হয়ে উঠছে শাসক দল। এখন থেকে প্রশাসন কড়া হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না-করতে পারলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে শুধু শাসক দল নয়, দায়ী থাকবে প্রশাসনও।’’
রবিবার লাউদা পঞ্চায়েতের বনমালীচট্টা গ্রামে গিয়ে শোনা গেল নানা কথা। ঠিক কী হয়েছিল সে দিন?
স্থানীয় প্রভাতী ক্লাব গত ১৫ বছর ধরেই নানা পুজো, অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। শনিবারও তেমনই একটি অনুষ্ঠান ছিল। সেই উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রা গ্রামের রাস্তায় ঘুরছিল। সে সময় বিডিও-র নেতৃত্বে পরিদর্শক দলের গাড়ি শোভাযাত্রাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। এতেই কটূক্তি করেন কয়েকজন ক্লাব সদস্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ক্লাবের প্রায় সব সদস্যই সে দিন মদ্যপ ছিলেন। সেই কটূক্তি থেকেই বচসা গড়ায় হাতাহাতিতে। মার খান স্বয়ং বিডিও। শনিবারের ঘটনায় ধৃত ন’জনই তৃণমূল কর্মী, জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। এমনকী ধৃত সতীনাথ দাস লাউদা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন তৃণমূল প্রধান অতিথি রঞ্জন মান্নার জামাই।
শুধু তাই নয়, তৃণমূল যোগের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন ধৃতদের পরিবারের সদস্যরাও। ধৃত শঙ্কর দাসের স্ত্রী পূর্ণিমা দাস বলেছেন, “স্বামীকে গ্রেফতারের পর কাঁথি ৩ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বিকাশ বেজ ও বিডিও-র কাছে গিয়ে দোষ স্বীকার করেছিলাম। অনুরোধ করেছিলাম আমার স্বামীকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কাজ হয়নি।” ঘটনায় অস্বস্তিতে পড়েছে শাসক দলও। শনিবারই পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বিকাশ বেজ স্বীকার করে নিয়েছিলেন ধৃতরা তৃণমূল কর্মী। যদিও এ দিন তিনি মানতে চাননি যে ঘটনার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক যোগ রয়েছে। কাঁথি-৩ পঞ্চায়েত সমিতির বন ও ভূমি কর্মাধ্যক্ষ হৃষিকেশ গোল আবার দাবি করেছেন, ‘‘ধৃতদের সকলেই তৃণমূল ঘনিষ্ঠ নয়। অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও আছেন। শুধু তৃণমূলকে দোষারোপ করা ঠিক নয়।” একই বক্তব্য লাউদা অঞ্চল তৃণমূল সভাপতি আনন্দময় দাসেরও। তাঁর কথায়, ‘‘সিপিএম ও অন্যান্য দলের কর্মী সমর্থকরাও যুক্ত। কিন্তু পুলিশ যাদের সামনে পেয়েছে তাদেরই ধরেছে।”
যদিও শাকাবাই গ্রামে ওই ক্লাবের অনুষ্ঠানস্থলের সামনে দেখা গেল, পত পত করে উড়ছে তৃণমূলের পতাকা। পাশেই যাঁরা থাকেন, ব্যবসা করেন তাঁরা কিন্তু জানিয়েছেন, গ্রামে তৃণমূলের যাবতীয় দলীয় কাজকর্ম ওই ক্লাব সদস্যরাই করে থাকেন।
কাঁথির মহকুমাশাসক ও নিবার্চন আধিকারিক সরিৎ ভট্টাচার্য জানান, “কাঁথি-৩ বিডিও ও উত্তর কাঁথি বিধানসভা কেন্দ্রের-সহ নিবার্চন আধিকারিককে আক্রমণের ঘটনায় প্রশাসন কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছে।’’ জেলাশাসক অন্তরা আচার্য নিজেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মারিশদা থানার পুলিশ রবিবার ধৃতদের কাঁথি আদালতে হাজির করলে বিচারক ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।