Durgapur

লড়াইয়ের পথ ধরে ‘কুষ্ঠ পাড়া’ থেকে ‘সবুজ পল্লি’

দুর্গাপুরের পলাশডিহা অঞ্চলের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের যে পাড়ায় তাঁর বাড়ি, সেটি সকলে চিনত ‘কুষ্ঠ পাড়া’ নামে। বহু বছর আগে সেখানে কুষ্ঠরোগীদের বসবাস ছিল। রোগ চলে গিয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু নামটা থেকে গিয়েছিল।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ ১০:০২
Share:

দুর্গাপুরে পলাশডিহার সবুজ পল্লিতে চলছে পড়াশোনা। — নিজস্ব চিত্র।

আগে কেউ ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে অস্বস্তিই হত সঞ্জীব রামের। দুর্গাপুরের পলাশডিহা অঞ্চলের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের যে পাড়ায় তাঁর বাড়ি, সেটি সকলে চিনত ‘কুষ্ঠ পাড়া’ নামে। বহু বছর আগে সেখানে কুষ্ঠরোগীদের বসবাস ছিল। রোগ চলে গিয়েছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু নামটা থেকে গিয়েছিল। সেই নাম এবং তা ঘিরে কুসংস্কারের বোঝা বইতে হচ্ছিল নতুন প্রজন্মকেও। অবশেষে সেই অঞ্চলের নাম হচ্ছে ‘সবুজ পল্লি’। সঞ্জীব বলছেন, “আগে ঠিকানা বললে মনে হত, মানুষ অন্য চোখে দেখছে। এখন গর্ব করে বলতে পারব, আমি সবুজ পল্লির বাসিন্দা।”

ওই পাড়ায় ২৫-৩০টি পরিবারের বাস। দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানে থাকার সুযোগই মিলত না। বদলের সূচনা হয় ২০২১ সালে। সে বছর পাড়ার বাসিন্দা পায়েল মল্লিককে পড়াশোনার বই দিতে গিয়েছিলেন সমাজকর্মী অরিন্দম সরকার। পায়েলের বাবা সুকুমার তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, পাড়ার ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু করার। সেই অনুরোধ থেকেই শুরু নতুন যাত্রার। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মাঝে, ২০২১ সালের ১৫ অগস্ট, অরিন্দমের বাড়ির উঠোনে ত্রিপল টাঙিয়ে শুরু হয় পড়াশোনার ছোট্ট ক্লাস। প্রথমে কয়েক জন। পরে যোগ দেয় আরও শিশু-কিশোর। আজ ওই এলাকার অধিকাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ে। স্কুলছুটের সংখ্যাও তুলনায় কম।

ওই পাড়ার বাসিন্দা বিনীতা মল্লিকের কথায়, “অরিন্দম স্যর আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছেন। শুধু পড়াশোনা নয়, ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শিখিয়েছেন।” ক্রমে এই কাজে যুক্ত হন অরিন্দমের ছাত্রছাত্রীরাও। তৈরি হয় স্বেচ্ছাসেবী দল ‘আনন্দলোক’। অনুদান ছাড়াই তারা উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করে। নাচ, গান, আঁকা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয় শিশুদের। পেশায় নার্স সুপ্রিয়া সেন বিনামূল্যে নাচ শেখাতে শুরু করেন। তাঁর কথায়, “লড়াইটা আমাদের সবার ছিল। এলাকার শিশুদের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনাই ছিল লক্ষ্য।”

এলাকার মহিলাদের বড় সমস্যা ছিল শৌচাগারের অভাব। অনেককেই বাড়ির বাইরে যেতে হত। দুর্গাপুর পুর নিগমের প্রশাসকমণ্ডলীর প্রধান অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়কে চিঠি লেখেন অরিন্দমেরা। পাড়ার মেয়েদের প্রশাসনের কাছে নিয়ে গিয়ে সমস্যার কথা জানানোর সুযোগও করে দেন। ফল মেলে। এলাকায় একটি সাধারণ শৌচাগার তৈরি হয়। পাশাপাশি, গড়ে ওঠে আটচালার পড়াশোনার ঘর, যা এখন এলাকার শিশুদের শিক্ষাকেন্দ্র। ছাত্রী কোয়েল বাউড়ি বললেন, “এক সময়ে সমাজে অবহেলিত ছিলাম। এখন মানুষ আমাদের সম্মান দেয়।”

তবে, পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল পরিচয়ের লড়াই। বহু বছর আগে কুষ্ঠ পাড়ার বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের সাগরভাঙায়। কিন্তু তাঁদের জীবন-জীবিকা ছিল পলাশডিহাতেই। তাই তাঁরা স্থান পরিবর্তন করেননি। অথচ, ভোট দিতে যেতে হত সাগরভাঙায়। প্রশ্ন ওঠে, যে পাড়ায় আর কুষ্ঠ রোগী নেই, সেখানে কেন এখনও ‘কুষ্ঠ পাড়া’ নাম? প্রশাসনের কাছে বার বার আবেদন জানান এলাকার মানুষ। আইনজীবী পিয়ালী দাস বলেন, “অনেক দিন ধরে এই উদ্যোগের সঙ্গে রয়েছি। খুব কাছ থেকে দেখেছি, মানুষ কী ভাবে নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা ফিরে পাওয়ার জন্য লড়াই করেছে।”

অবশেষে প্রশাসনের উদ্যোগে এ বছর ভোটার কার্ডে বদলে যায় নাম। ‘কুষ্ঠ পাড়া’ হয়ে ওঠে ‘সবুজ পল্লি’। এখন আর ভোট দিতে সাগরভাঙায় যেতে হবে না তাঁদের। নতুন নামই হয়ে উঠেছে স্থায়ী পরিচয়। মূল উদ্যোক্তা অরিন্দম বলেন, “এই পরিবর্তনের আসল নায়ক এলাকার মানুষ। ‘কুষ্ঠ পাড়া’ থেকে ‘সবুজ পল্লি’ হওয়া শুধু নাম বদল নয়, আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার গল্প।” আগামী ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পাড়ার প্রবেশপথে বসবে সেই বোর্ড— ‘সবুজ পল্লি’।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন