শমীক ভট্টাচার্য। —ফাইল চিত্র।
দল আড়েবহরে বড় হওয়ার পরে দলের জন্য নতুন বাড়ি খোঁজা শুরু করেছিল বিজেপি। খুঁজে পেতে দেরি হয়নি। খাতায়কলমে রাজ্য বিজেপির ঠিকানা এখনও মধ্য কলকাতার ৬ নম্বর মুরলীধর সেন লেন হলেও কাজকর্ম সবই হয় বিধাননগরের পাঁচ নম্বর সেক্টরের নতুন দফতর থেকে। দলের পরে এ বার রাজ্য সভাপতির জন্যও নতুন বাড়ির খোঁজ শুরু হল। শমীক ভট্টাচার্যের নিজস্ব আস্তানায় আর স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। কারণ, বিভিন্ন। তবে স্থানাভাবে এমন একটি গুরুতর একটি ব্যবস্থাপনা আটকে রয়েছে, ভোটের আগে যা অত্যন্ত জরুরি বলে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও মনে করছেন।
শমীক বিধাননগরে থাকেন ১৯৯১ সাল থেকে। এই বাড়ি শমীকের বাবার তৈরি করা। তবে বিধাননগরের বাড়িটিতে যখন এসেছিলেন, তখন তিনি মধ্য যৌবনে। তত দিনে বিজেপির সর্বক্ষণের কর্মীও হয়ে গিয়েছেন। শৈশব, কৈশোর, প্রথম যৌবন কেটেছিল হাওড়ার শিবপুরে। তাই এখনও নিজেকে ‘হাওড়ার ছেলে’ বলতে ভালবাসেন। কিন্তু নয় নয় করে বিধাননগরের বিএইচ ব্লকে ৩৫ বছর কাটিয়ে ফেলেছেন। পরিজন থেকে দলীয় কর্মী, শুভানুধ্যায়ী থেকে সরকারি লোকজন, সকলেই বরাবর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন ওই বাড়িতেই। দলের প্রধান মুখপাত্র থাকাকালীন প্রায় রোজ বিকেলে সাংবাদিক বৈঠক করতেন ওই বাড়ির গ্যারাজের সামনের একফালি উঠোনে দাঁড়িয়ে। আর দিনভর তাঁর বারান্দায় খোলা থাকত সার সার জুতো-চটি। বসার ঘর হয়ে থাকত সর্বজনীন বৈঠকখানা।
শমীক বিজেপির রাজ্য সভাপতি হয়েছেন গত ৩ জুলাই। তার পর থেকে সেই ভিড় ১০ গুণ হয়েছে। দিবারাত্র লোকজনের আনাগোনা লেগে থাকছে। বিএইচ ব্লকের গলি সার সার গাড়ির ভিড়ে অপরিসর হয়ে পড়ছে। বসার ঘর উপচে ভিড় পৌঁছে যাচ্ছে বাড়ির ভিতর দিকেও। পার্টি অফিসে তো তাঁর সঙ্গে দেখা করার ভিড় থাকেই। কিন্তু দলের পুরনো কর্মী-সমর্থক-সহ অনেকের কাছেই শমীকের বাড়ির ঠিকানাটা এত চেনা যে, সাতসকালে হোক বা সন্ধ্যার পরে, যে যাঁর নিজের সুবিধা মতো সময়ে সে ঠিকানায় পৌঁছে যান। বিজেপির নতুন রাজ্য সভাপতি প্রায় কারওকেই হতাশও করেন না। সংক্ষিপ্ত হলেও, সাক্ষাৎ প্রত্যেককেই দেন। কিন্তু এত ভিড় সামাল দেওয়ার মতো পরিস্থিতি শমীকের বাড়িতে নেই। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের। অতএব নতুন ঠিকানার খোঁজ শুরু হয়েছে রাজ্য সভাপতির জন্য।
রাজ্য বিজেপি সূত্রের খবর, বিধাননগরেই শমীকের জন্য নতুন বাড়ির খোঁজ শুরু করেছে দল। কারণ সে ক্ষেত্রে শমীককে পৈতৃক ঠিকানা থেকে খুব দূরে যেতে হবে না। আবার দলের রাজ্য দফতরও কাছাকাছিই থাকবে। তবে নতুন বাড়ি খোঁজার কারণ শুধু সাক্ষাৎপ্রার্থীদের ভিড় নয়। আরও গুরুতর কারণ রয়েছে বলে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে।
শমীক বিজেপির রাজ্য সভাপতি হওয়ার পরেই তাঁর দলের তরফ থেকে তাঁকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নিতে বলা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকেও শমীকের কাছে বার্তা এসেছিল বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। শমীক সে সব অনুরোধ পত্রপাঠ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। নিরাপত্তা নেননি। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ বদলাচ্ছে। নির্বাচন যত কাছে আসছে, রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ ততই বাড়ছে। অচিরেই তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনের মরসুমে পশ্চিমবঙ্গে হিংসার ছবিও কারও অজানা নয়। অতএব গত সপ্তাহে দিল্লিতেই শমীক ফের দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছ থেকে বার্তা পেয়েছেন। তাঁকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে নিতে বলা হয়েছে বলে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে। আর তিনি এখন যে বাড়িতে থাকেন, সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জন্য স্থান সঙ্কুলানও প্রায় অসম্ভব।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি থাকাকালীন দিলীপ ঘোষের জন্য কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা এসেছিল। তিনি এখনও তা পান। পরে সুকান্ত মজুমদার রাজ্য সভাপতি হয়েও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পান। সুকান্ত এখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। ফলে নিরাপত্তা শুধু বহাল থেকেছে নয়, আরও বেড়েছে। এঁদের দু’জনের জন্যও রাজ্য সভাপতি থাকাকালীন দলকে আলাদা বাড়ি খুঁজতে হয়েছিল। কারণ নিরাপত্তা বাহিনীর থাকার ব্যবস্থা করতেই বাড়ির অনেকটা জায়গা চলে যায়। দিলীপ পরে নিজের বাংলোয় স্থানান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু সুকান্ত নিউটাউনে দলের দেওয়া বাড়িতেই এখনও থাকেন। সেখানেই সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন। সেই বাড়িতেই একটি তলা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের জন্য। শমীকের জন্যও এ বার তেমন ব্যবস্থাপনার চেষ্টায় বিজেপি।
এমন কোনও বাড়ি বিজেপির রাজ্য সভাপতির জন্য খোঁজা হচ্ছে, যেখানে অন্তত ৮-১০টি ঘর থাকবে। কারণ সভাপতির নিজের ঘর থাকতে হবে। তাঁর আপ্ত সহায়ক হিসাবে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের থাকার ঘর লাগবে। বৈঠক করার জন্য, সাধারণ সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে দেখা করার জন্য, খাওয়াদাওয়ার জন্য ঘর লাগবে। যাঁরা দেখা করতে আসবেন, তাঁদের বসতে দেওয়ার মতো বড় হল লাগবে। আর ভোটের মুখে শমীককে যদি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নিতেই হয়, তা হলে বাহিনীর থাকার জন্যও অন্তত একটা তলা ছেড়ে রাখতে হবে।
কোন পর্যায়ের নিরাপত্তা দেওয়া হবে, তা ঝুঁকি বিচার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক স্থির করে। সুকান্ত পান জ়েড পর্যায়ের নিরাপত্তা। শুভেন্দু অধিকারী বা শান্তনু ঠাকুরও তাই পান। শমীকের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বিচার করে ওয়াই, ওয়াই প্লাস অথবা জ়েড পর্যায়ের নিরাপত্তা দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাঁর বাড়িতে ১০-১২ থেকে ৩০-৩২ জনের থাকার ব্যবস্থা করতে হতে পারে। যা বিএইচ ব্লকের বাড়িতে অসম্ভব। অতএব রাজ্য সভাপতির জন্য বিধাননগরেই নতুন বাড়ি খুঁজছে দল। তবে সে ক্ষেত্রে দলের মতোই, রাজ্য সভাপতিরও শুধু আস্তানা বদল হবে, স্থায়ী ঠিকানা অপরিবর্তিতই থাকবে।