Calcutta High Court

বাবা-মা বনাম ছেলের মামলা! কলকাতা হাই কোর্টের নিয়োগ করা কমিটির বিচিত্র অভিজ্ঞতা শুনে কী রায় দিলেন বিচারপতি

বৃদ্ধা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। তিনি আবেদন করে জানান, সারা জীবন কষ্ট করে ছেলে মানুষ করেছেন। ছেলেকে আইআইটি খড়্গপুর, আইআইএম অহমদাবাদে পড়িয়েছেন। এখন সেই ছেলে সম্পর্ক রাখতে চায় না।

Advertisement

ভাস্কর মান্না

শেষ আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ ২১:৪৩
Share:

ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

সোনারপুরের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বাবা-মায়ের বক্তব্য, ১৩ বছর ছেলে বাড়িতে আসেন না। বাড়িতে আসুক। তাঁদের সঙ্গে কথা বলুক। ফোন করে খোঁজখবর নিক।

Advertisement

একমাত্র ছেলের বক্তব্য, বাবা-মায়ের যা প্রয়োজন, তা তিনি করছেন। তাঁদের বিমার টাকা মেটান। আদালতের নির্দেশে মাসে মাসে টাকাও দেন। কিন্তু তিনি তাঁদের বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারবেন না।

দুই পক্ষের বাদ-বিবাদ মহকুমাশাসক, জেলাশাসকের কাছ থেকে কলকাতা হাই কোর্টে গড়িয়েছে। হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ, ‘‘বাবা-মায়ের আসল সমস্যা ছেলে; টাকা নয়। এই ক্ষমতা আমাদের নেই, আইনেও নেই যে, ছেলেকে বলব, বাড়ি যান।’’ তার পরেই আদালত ছেলেকে নৈতিক দায়িত্বের কথা মনে করায়। জানায়, সেই দায়িত্ব থেকেই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন, স্বাস্থ্যবিমা করবেন। তবে বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে থাকবেন, সে কথা আদালত বলতে পারবে না। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, ‘‘অনেক চেষ্টা করেছি ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর। কিন্তু আমরা ব্যর্থ। কিছুই করার নেই।’’ সিনিয়র সিটিজেন আইনে ছেলে বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু আদালত বলতে পারে না, কত টাকা দেবে। তবে স্ত্রীর ক্ষেত্রে বলতে পারে।

Advertisement

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে। ওই বছর কুশল রায়ের মা গীতা রায় এবং বাবা আশিসকুমার রায় বারুইপুর এসডিও (মহকুমাশাসক)-র কাছে অভিযোগ করেন, ছেলে খোঁজ নেন না। তাঁদের আর্জি ছিল, ছেলে তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুক। তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুক। এর পরেই এসডিও ছেলে কুশলকে নির্দেশ দেন, বাবা-মায়ের চিকিৎসা করাতে হবে। ২০০৭ সালের সিনিয়র সিটিজেন আইন মেনে বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ দেবেন ছেলে। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ২০২৩ সালে হাই কোর্টে মামলা করেন কুশল। মামলায় দেখা গিয়েছে, বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ বহনের কোনও প্রয়োজনই নেই। বাবা আশিস ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। মা গীতা ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক। দু’জনে নিয়মিত পেনশন পান।

২০২৩ সালে হাই কোর্ট বলে, এসডিও নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ তিনি দিতে পারেন না জানিয়ে তা বাতিল করে দেয়। হাই কোর্ট বাবা-মাকে নতুন করে আবেদন করতে বলে। তার পরে বাবা-মা আবার এসডিও-র কাছে যান। তাঁদের দাবি ছিল, ছেলে ফোন করুক, বাড়িতে আসুক, কথা বলুক, চিকিৎসার জন্য মাসে ৫,০০০ টাকা সাহায্য করুক। সময়ে-অসময়ে তাঁদের পাশে থাকুক।

এসডিও বাবা-মায়ের এই দ্বিতীয় বারের আর্জি খারিজ করে দেন। তার পরে বাবা-মা জেলাশাসকের দ্বারস্থ হন। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখেন, জানতে পারেন, কুশলের বাবা-মা আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল। কিন্তু বয়স হয়েছে। তিনি জানান, প্রতি মাসে বাবা-মাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে দেবেন ছেলে। কিন্তু তিনি ছেলেকে বলতে পারেন না যে, বাবা-মায়ের কাছে বাড়িতে যেতে হবে। তাঁদের সঙ্গে থাকতে হবে। ডিএমের কথায়, ‘‘এটা আমার ক্ষমতার মধ্যে পড়ে না। আমি ছেলেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে বাধ্য করতে পারি না।’’

এর পরে কুশল আবার হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। তিনি বলেন, ‘‘বাবা-মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকার আমি ছেড়েছি। তাঁদের সম্পত্তির দাবি করব না। তাঁদের স্বাস্থ্যবিমা চালিয়ে যাচ্ছি। আদালতের নির্দেশ মেনে সাহায্য করছি। বাবা-মা ডিএম, এসডিও-র কাছে গিয়ে আমাকে জোর করার চেষ্টা করছে।’’

কুশলের মা গীতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। তিনি আবেদন করে জানান, সারা জীবন কষ্ট করে ছেলে মানুষ করেছেন। ছেলেকে আইআইটি খড়্গপুর, আইআইএম অহমদাবাদে পড়িয়েছেন। এখন সেই ছেলে সম্পর্ক রাখতে চায় না। তাঁর কথায়, ‘‘আমি হৃদরোগে আক্রান্ত, স্টেন্ট বসেছে। আমার স্বামীর ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে। ১৩ বছর ছেলে বাড়িতে আসে না। ফোন নম্বর ব্লক করেছে। ইমেল ব্লক করেছে। নাতির সঙ্গেও যোগাযোগ করতে দেয় না। কয়েক দিন হলেও বাড়িতে এসে থাকুক।’’ বাবা-মা আদালতে আরও বলেন, তাঁদের নাতি নীল রায় ছোটবেলায় সোনারপুরের বাড়িতে আসত এবং তাঁদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তাঁরা নাতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছেন না। নাতি এখন আমেরিকায় গবেষণা করছেন। তাঁদের অভিযোগ, নীলের বাবা-মা, বিশেষ করে তাঁর মা, নাতির যুক্তরাষ্ট্রের ঠিকানা ও ব্যক্তিগত ফোন নম্বর তাঁদের দেননি।

ছেলে কুশলের পাল্টা দাবি, বাবা-মা তাঁর বিরুদ্ধে কলকাতা ও মুম্বইয়ে একাধিক অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগের কারণে তাঁকে বারবার পুলিশের ফোন পেতে হয়েছে। তাই তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে গেলে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে তাঁর।

বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের পর্যবেক্ষণ, এটা আইনের মামলা নয়। এটা একটা ভেঙে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্কের মামলা। আদালত মনে করছে, বাবা-মা এবং ছেলের মন বোঝার জন্য একটা কমিটি গঠন করার প্রয়োজন। চার সদস্যের কমিটি গড়ে আদালত। সেই কমিটিতে ছিলেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং ফ্যামিলি কাউন্সেলর। কমিটি আদালতে বলে, ‘‘আমরা ব্যর্থ এই সম্পর্ক জোড়া লাগাতে। পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে। কেউ কারও বক্তব্য শুনতে রাজি নয়। সকলে নিজের অবস্থানে অনড়।’’ কমিটির রিপোর্ট থেকে আদালত এ-ও জানতে পারে, বাবা-মা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, নিয়মিত পেনশন পান। দোতলা বাড়ি, গাড়ি রয়েছে তাঁদের। ১৪৮টি ফিক্সড ডিপোজিটও রয়েছে।

তার পরেই আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘‘বাবা-মায়ের আসল সমস্যা ছেলে। টাকা নয়। ছেলে ফোন করেন না, বাড়ি আসেন না, সময় দেন না। কিন্তু এই ক্ষমতা আমাদের নেই, আইনেও নেই যে, ছেলেকে বলব বাড়ি যাও।’’ বিচারপতি আরও বলেন, ‘‘ছেলেকে একটা কথাই বলতে পারি, মানুষের একটা মোরাল ডিউটি, নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। সেখান থেকে বৃদ্ধ বাবা-মার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। স্বাস্থ্যবিমা করবে। অনেক চেষ্টা করেছি ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগানোর। কিন্তু আমরা ব্যর্থ। কিছুই করার নেই।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement