শুভেন্দু অধিকারী। —ফাইল চিত্র।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং পূর্ববর্তী সরকারের আমলে হওয়া দুর্নীতির অভিযোগগুলির তদন্তে শুরু থেকেই কড়া অবস্থান নিয়েছে নতুন সরকার। সোমবার নবান্ন সভাঘরে অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক বৈঠকে সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারি স্কুলগুলিতে নিম্নমানের ইউনিফর্ম সরবরাহকে কেন্দ্র করে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসতেই অর্থ এবং বস্ত্র দফতরের শীর্ষ আধিকারিকদের কাছে জবাব তলব করেন মুখ্যমন্ত্রী।
নবান্ন সূত্রে খবর, সোমবার সমস্ত দফতরের সচিব পর্যায়ের আধিকারিকদের নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই বৈঠকেই সরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সরবরাহ করা পোশাকের নিম্নমান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ধারিত মানের কাপড় ব্যবহার না করেই ইউনিফর্ম তৈরি করা হয়েছে। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই পোশাক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে দীর্ঘ দিন ধরেই অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সরকারি স্কুলের ইউনিফর্ম তৈরির ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট গুণমান, কাপড়ের মান এবং অন্যান্য প্রোটোকল স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা থাকে। কিন্তু অভিযোগ, সেই নির্দেশিকা কার্যত উপেক্ষা করেই বেশ কিছু পোশাক প্রস্তুতকারী সংস্থা নিম্নমানের কাপড় ব্যবহার করে ইউনিফর্ম সরবরাহ করেছে। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, সরকারি নিয়ম না মেনেও কী ভাবে সেই পোশাক সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হল এবং কেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা আগেভাগে বিষয়টি খতিয়ে দেখলেন না।
বস্ত্র দফতরের সচিব এবং অন্য আধিকারিকদের কাছে মুখ্যমন্ত্রী জানতে চান, সরবরাহকারী সংস্থাগুলি আদৌ নির্ধারিত গুণমান বজায় রেখেছিল কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, নিজের বক্তব্যের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী কিছু নথি ও প্রমাণও বৈঠকে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সরকারি প্রকল্পে কোনও ধরনের দুর্নীতি বা গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না এবং তাঁর সরকার ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতিতেই চলবে। এর পর মুখ্যমন্ত্রীর কড়া প্রশ্নের মুখে পড়েন অর্থ দফতরের আধিকারিকেরাও। নিম্নমানের ইউনিফর্মের জন্য কী ভাবে সরকারি কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকার বিল মঞ্জুর করা হল, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। অর্থ দফতরের সচিবের কাছে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি জানতে চান, কোন রিপোর্ট বা কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে ওই সংস্থাগুলিকে অর্থ প্রদান করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, যদি সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী ইউনিফর্ম তৈরি না হয়ে থাকে, তবে কোনও ভাবেই সরকারি অর্থ সেই সংস্থাগুলিকে দেওয়া উচিত ছিল না।
নবান্ন সূত্রের খবর, অর্থ দফতরের কিছু আধিকারিক তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করলেও মুখ্যমন্ত্রী তাতে সন্তুষ্ট হননি। তিনি জানতে চান, অর্থ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে কেন সেই সময় কোনও আপত্তি বা পর্যবেক্ষণ নথিভুক্ত করা হয়নি। বৈঠকের শেষে মুখ্যমন্ত্রী অর্থ এবং বস্ত্র দফতরকে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে বিস্তারিত লিখিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কার গাফিলতিতে নিম্নমানের পোশাক সরবরাহ করা হয়েছে, কোন সংস্থাকে কী ভাবে বরাত দেওয়া হয়েছিল এবং কার অনুমতিতে সরকারি অর্থ মেটানো হয়েছে— সেই সমস্ত বিষয় রিপোর্টে উল্লেখ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, দুই দফতরের রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কড়া ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি রুখতে মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।