খারাপ সময়। কলকাতার একটি সার্কাসে। ছবি: দেশকল্যাণ চৌধুরী।
আগে বলা হতো মরা হাতির দাম লাখ টাকা। এখন জ্যান্ত হাতির দামই বাতিল ৫০০ টাকার নোটের মতো!
বাতিল নোটের তবু একটা যাওয়ার জায়গা রয়েছে। কিন্তু সার্কাসের হাতিদের এই মুহূর্তে যাওয়ারও কোনও জায়গা নেই। ফেমাস সার্কাসের চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বা কোহিনূর সার্কাসের জয়নুল হক বড় বিপদে পড়েছেন। দু’জনেরই এক সুর, ‘‘তাঁবুর পাশে হাতিদের একবারটি দেখতে এখনও ভিড় জমে। কিন্তু ভয়ে খেলা দেখাতে পারছি না। সেন্ট্রাল জু অথরিটির (সিজেডএ) নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যে!’’
সেপ্টেম্বর মাসেই সিজেডএ-র রিপোর্টে উঠে এসেছে সার্কাসের হাতির দুর্গতির ফিরিস্তি। সেই মোতাবেক ৭ ডিসেম্বর সিজেডএ-র তরফে বলা হয়েছে, সার্কাসের হাতিরা ভাল নেই। তারা নির্যাতিত। অসুরক্ষিত। সেই হাতির খেলা আর দেখানো যাবে না। সিজেডএ-র সদস্যসচিব ডি এন সিংহ নিজে বলছেন, ‘‘সার্কাসের হাতিগুলোর ছবি দেখে আমার চোখে জল আসছিল। এ ভাবে কেউ হাতি রাখে? সার্কাস থেকে তাই হাতি বাতিল করতে হল।’’
ফল? এক দিকে খেলা দেখানো বন্ধ, অন্য দিকে হাতির খোরাকের জন্য দিনে প্রায় হাজার পাঁচেক টাকার ধাক্কা। জাঁতাকলে পড়ে গিয়েছেন সার্কাসের কর্তারা। এমনিতেই নোট-কাণ্ডের জেরে মানুষ টাকা খরচ করছেন টিপে টিপে। সার্কাসে লোকই তেমন হচ্ছে না। তারই মধ্যে এক ম্যানেজারের কথায়, ‘‘অনেকে হাতির খেলা দেখতে পাবেন না বলে তাঁবুতে এসেও টিকিট কাটছেন না। কিন্তু হাতিগুলোকে খাওয়াতে হচ্ছে। ধনে-প্রাণে মারা যাব আমরা।’’
এখন হাতিগুলো যাবে কোথায়? সেই নির্দেশ আসেনি। ফলে কলকাতায় এই মুহূর্তে যে তিনটি সার্কাস তাঁবু ফেলেছে, ১০টি হাতি তাদের সঙ্গেই রয়েছে। তাদের পুনর্বাসন নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের আমলারা পরস্পরের কোর্টে বল ঠেলছেন। সিজেডএ-র সদস্যসচিবের দাবি, ‘‘সর্বত্র স্থানীয় বনকর্তা, কেন্দ্রীয় পশুকল্যাণ বোর্ডের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েই সার্কাসের হাতির ছাড়পত্র বাতিল করা হয়েছে। হাতিদের সরাবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার।’’ কোথায় সরানো যেতে পারে? উত্তর আসে, ‘‘কোনও জাতীয় উদ্যান বা আমাদের হাতি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো যেতে পারে।’’ হরিয়ানার যমুনানগরের বনসন্তুর, কর্নাটকের হুনসুর ও বিহারের বেতিয়ায় হাতিদের তিনটি ঠিকানাও তৈরি। সদস্যসচিবের দাবি, ‘‘দেশে এখন যে ক’টি সার্কাস রয়েছে, তাদের গোটা ২৫ হাতির পুনর্বাসন এখনও বাকি রয়েছে।’’
সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের এখানে কী ভূমিকা? রাজ্য জু অথরিটির সদস্যসচিব বিনোদ যাদবের বক্তব্য, ‘‘হাতি পুনর্বাসন নিয়ে সিজেডএ এখনও রাজ্য বন দফতরকে কোনও নির্দেশ দেয়নি। তা না এলে কিছু করার নেই।’’ তাঁর দাবি, এর আগে সার্কাসের বাঘ-সিংহ-ভালুকদেরও নির্দিষ্ট নির্দেশের ভিত্তিতেই সরানো হয়েছিল। কয়েক মাস আগে নির্দেশ পেয়েই অলিম্পিক সার্কাসের হাতিদের জলদাপাড়ায় সরায় বন দফতর।
এ বারে নির্দেশ কবে আসবে? সেই টানাপড়েনেই ঝুলে সার্কাসের অতিকায় আবাসিকেরা। কোহিনূর ও অজন্তা সার্কাসের জয়নুল সাহেবের মতো কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, সিজেডএ-র বিরুদ্ধে তাঁরা কোর্টে যাবেন। বাঘ-সিংহ বিদায়ের পরে হাতিও বাদ দিলে সার্কাসে রইলটা কী!