CPM TMC

পরিবর্তনের দেড় দশক পরেও ‘পরিবর্তন’ নেই! প্রশাসক মমতা এখনও সেই বিরোধীর মেজাজে, সিপিএমে এখনও শাসকের স্বর

ষাট এবং সত্তরের দশকে যে বামেরা ছিল আন্দোলনের জন্য খ্যাত, তারা ৩৪ বছর শাসন ক্ষমতায় থেকে শাসকের স্বর ত্যাগ করতে পারেনি। আবার আশির দশকের গোড়া থেকে মমতা যে রাজনীতি করে এসেছেন, মুখ্যমন্ত্রী হয়েও তিনি সেই ধারা ছাড়তে পারেননি।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৫
Share:

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দেড় দশক আগে পশ্চিমবঙ্গের শাসক সিপিএম এবং বিরোধী তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ কবীর সুমনের একটি লাইন উচ্চারণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে, ‘ছেড়েছ তো অনেক কিছুই পুরনো অভ্যেস!’

Advertisement

কারণ, সিপিএম তাদের শাসক অবস্থার স্বর এখনও ছাড়েনি। যেমন তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী মমতা ছাড়েননি তাঁর পুরনো বিরোধী নেত্রীর মেজাজ। সোমবার দিনভর দিল্লিতে মমতা যে ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন, তাতে সেই আলোচনা নতুন করে উঠে এসেছে দুই শিবিরেই। আলিমুদ্দিনের নেতাদের অনেকেই একান্ত আলোচনায় বলছেন, ‘‘রেখেছ সিপিএম করে, বিরোধী করোনি।’’ আর তৃণমূলের নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, ‘‘হেরিটেজকে রক্ষা করতেই হবে। দিদি সেটাই করছেন।’’ ঠিকই। মমতার কাছে বিরোধী মেজাজই ‘হেরিটেজ’। ‘ঐতিহ্য’। চেনা মাঠ।

গত ১৫ বছরে অজস্র ঘটনায় বামেদের মধ্যে এই আলোচনা শোনা গিয়েছে যে, এমতাবস্থায় বিরোধী আসনে যদি মমতা থাকতেন, তা হলে কী হতে পারত। সেই আলোচনার উৎস ছিল ‘আক্ষেপ’। শাসকের জামা ছেড়ে ‘যথাযথ বিরোধী’ না-হতে পারার হতাশা। আবার ২০১৯ সালের পরে রাজ্য রাজনীতির বিরোধী পরিসরে বিজেপি মাথা তোলার পর থেকে প্রশাসক মমতা ফিরে গিয়েছেন তাঁর পুরনো ভূমিকায়। বারংবার বিরোধী নেত্রী হিসাবেই প্রতিভাত হয়েছেন। সেই ভূমিকা পালনের তাড়নায় এমনকি, কখনও কখনও আইনকানুনের পরোয়া না-করেও জড়িয়ে পড়েছেন সংঘাতে। যে সব উদাহরণ অধুনা বিরোধী বিজেপি এবং সিপিএম বারবার তুলে ধরে।

Advertisement

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এসআইআর-কে ‘অস্ত্র’ করে মমতা যে ভাবে ‘বিরোধী’ ভূমিকায় রাস্তায় নেমেছেন, পৌঁছে গিয়েছেন দিল্লিতে, তাতে অনেকেই ‘কৌশল’ দেখছেন। টানা ক্ষমতায় থাকলে গণতন্ত্রে স্থিতাবস্থা তৈরি হওয়াই দস্তুর। যেমন দস্তুর সেই স্থিতাবস্থার বিরোধী স্বর তৈরি হওয়া। তৃণমূলের বিরুদ্ধেও তা হয়েছে। অনেকের মতে, ভোটের আগে সেটাই মমতা ঘুরিয়ে দিতে নেমেছেন। শাসকের বদলে তিনি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন বিরোধী অবস্থানে। তাঁর সামনে ‘শাসক’ হিসাবে উপস্থাপিত করছেন বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনকে। তার পরে নেমে পড়েছেন রাস্তায়।

মমতা-শাসনের গত দেড় দশকে বামেরা যে রাস্তায় নামেনি তা নয়। কিন্তু তার ‘ঝাঁজ’ এবং ‘অভিঘাত’ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দলের মধ্যে। এমনকি, সিপিএমের বিভিন্ন গণ সংগঠনের মুখপত্রেও বিভিন্ন নেতার লেখায় একটা সময়ে ‘আন্দোলনের ধরন’ নিয়ে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গিয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পরে গোড়ার দিকে বিমান বসুর মতো নেতাদের ‘লাইন’ ছিল নিচুতলায় সংগঠনের মাধ্যমে মানুষকে সংগঠিত করা। আর গৌতম দেবের মতো নেতারা ‘কলকাতা অবরুদ্ধ’ করার বার্তা দিতেন। সিপিএমের অনেকেরই বক্তব্য, এ হেন দ্বন্দ্ব এবং ধন্দের ফলে দল ক্রমশ ফেসবুকমুখী হয়েছে। রাস্তার লড়াইয়ে প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। অনেকে পাল্টা বলছেন, এই সময়ের মধ্যেই মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, আভাস রায়চৌধুরীর মতো প্রথম সারির নেতানেত্রীরা আন্দোলন করতে গিয়ে জেলে গিয়েছেন। যদিও সেই ঘটনাগুলিকে বামেদের মধ্যেই অনেকে আবার ‘বিক্ষিপ্ত এবং বিচ্ছিন্ন’ হিসাবে দেখতে চাইছেন। তাঁদের বক্তব্য, সার্বিক ছবি যদি তা-ই হত, তা হলে ধর্মতলার সভা থেকে প্রবীণ নেতা হান্নান মোল্লাকে বলতে হত না, ‘‘কর্মসূচি না-করে আন্দোলন করতে হবে।’’ যে হান্নান দিল্লির কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন। যে আন্দোলনের ফলে নরেন্দ্র মোদী সরকারকে পিছু হটে তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছিল।

তৃণমূলের অনেকেই মানেন, তাঁদের প্রথম সরকারের সময়ে বিরোধী হিসাবে সিপিএম এবং দ্বিতীয় মেয়াদে কংগ্রেসের চেয়ে তৃতীয় মেয়াদের বিজেপি অনেক বেশি ‘আগ্রাসী’। বিরোধী দলনেতা হিসাবে সূর্যকান্ত মিশ্র বা আব্দুল মান্নানেরা ‘গঠনমূলক’ নমনীয়তা দেখালেও শুভেন্দু অধিকারী সে সবের ধার ধারেন না। অনেকের বক্তব্য, শুভেন্দুও ‘উগ্র’ বিরোধিতার পাঠ পেয়েছেন মমতার পাঠশালাতেই। ফলে তিনি জানেন কী করতে হয়। সেইমতোই চেষ্টা করছেন।

গত এক মাসে দেখা গিয়েছে মমতা তাঁর বিরোধী মেজাজ নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছেন। ইডি তল্লাশির সময়ে আইপ্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং সল্টলেকের অফিসে পৌঁছে কাগজ, ফাইল, মোবাইল, ল্যাপটপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। মঙ্গলবারই ওই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল। ইডি সময় চাওয়ায় তা পিছিয়ে গিয়েছে। সেই শুনানি ধার্য হয়েছে আগামী মঙ্গলবার।

ঘটনাচক্রে, মঙ্গলবারই দিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক ডেকেছেন মমতা। যেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গহে এসআইআর প্রক্রিয়ায় হয়রান মানুষদের হাজির করাবেন। হাজির করাবেন এসআইআর ‘আতঙ্কে’ মৃতদের পরিজনদেরও। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা আস্তিন থেকে বিরোধী নেত্রীর তাস বার করে ফেলেছেন। তার শুরু হয়েছে দিল্লিতেই সোমবার সকালে বঙ্গভবনের সামনে অমিত শাহের পুলিশের সঙ্গে সংঘাত দিয়ে। এসআইআরের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের রাখা হয়েছে বঙ্গভবনে। সেখানে দিল্লি পুলিশ গিয়ে তল্লাশি এবং জেরা শুরু করায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েন মমতা। সটান বঙ্গভবনে যান এবং দিল্লি পুলিশকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। তার পরে সন্ধ্যায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনের জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বৈঠকে তর্কাতর্কির পরে বয়কট করে বেরিয়ে এসে ক্ষোভের জ্বালামুখ খুলে দেন। যার মধ্যে অনেকেই মমতার অতীতের বিরোধীনেত্রী সুলভ ছায়া দেখতে পাচ্ছেন।

রাজ্যের রাজনীতি সম্পর্কে ধারাবাহিক ভাবে ওয়াকিবহাল অনেকের মতে, ষাট এবং সত্তরের দশকে যে বামেরা ছিল আন্দোলনের জন্য প্রসিদ্ধ, তারা ৩৪ বছর শাসন ক্ষমতায় থেকে শাসকের স্বর ত্যাগ করতে পারেনি। আবার আশির দশকের গোড়া থেকে মমতা যে রাজনীতি করে এসেছেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও তিনি সেই ধারা ছাড়তে পারেননি। বিভিন্ন কমিটির আমলাতন্ত্রের জট এখনও সিপিএমে প্রবল। হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সিপিএম রাজ্য রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের সাম্প্রতিক বৈঠকের পরে যে বিতর্ক নতুন করে বেআব্রু হয়ে পড়েছে। কিন্ত মমতা কোনও আমলাতান্ত্রিকতার ধার ধারেননি। তাঁর দলে তিনিই আলোচক, তিনিই নিয়ন্ত্রক, তিনিই আইন, তিনিই শেষকথা। সেই তিনি কখনও বেপরোয়া বিরোধিতার লাইন ছাড়েননি। যার সর্বশেষ উদাহরণ হল নির্বাচন কমিশনের বৈঠক বয়কট করে বেরিয়ে আসা।

সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী অবশ্য মানতে চান না যে, তাঁর দল এখনও শাসকের জার্সিই গায়ে রেখে দিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের কাছে বিরোধিতা মানে ধ্বংস নয়। গঠনমূলক। মমতার রাজনীতি ধ্বংসের। শাসক মমতা ধ্বংস করেছেন পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং শিল্পায়নের সম্ভাবনাকে। বিরোধী মমতা ধ্বংস করেছিলেন বিধানসভা। ফলে ওই বন্ধনীতে আমাদের ফেলা যাবে না।’’ আবার তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা যা যা প্রকল্প নিয়েছেন, তা নিহিত রয়েছে তাঁর অগ্নিকন্যা হিসাবে উঠে আসার মধ্যে। শক্তির দুটি রূপ থাকে। এক অভিভাবক আর দুই রুদ্রমূর্তি। মমতাদি দুটোই করছেন। আধার একটাই।’’

তবে বাম এবং তৃণমূলের নেতারা একান্ত আলোচনায় মানছেন, পুরনো অভ্যাস ছাড়া যায়নি। তৃণমূলের এক নেতার কথায়, ‘‘যে সোনালি গুহ ছিলেন উগ্র আন্দোলনের হোতা, তিনি বিধানসভায় ডেপুটি স্পিকার হওয়ার পরে ফুরিয়ে গেলেন। মমতাদি কিন্তু যৌথ অনুশীলন জারি রেখেছেন।’’ আবার সিপিএমের এক তরুণ নেতার কথায়, ‘‘বড়দের মাথায় এখনও লালবাতি আর পুলিশের স্যালুট বুদবুদ হিসাবে রয়ে গিয়েছে। তাঁরা তাই আমাদের খোলা ছুট দিতে চান না।’’

ঠিকই। মানুষ, হাজার হোক, অভ্যাসের দাস।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement