গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রাজনীতিক মুকুল রায়ের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার সমাজমাধ্যমে তিনি লিখলেন, সহকর্মী তথা সহযোদ্ধা মুকুলের অকস্মাৎ প্রয়াণে তিনি শোকস্তব্ধ। আবার মুকুলের তৃণমূলত্যাগ এবং দলে প্রত্যাবর্তনের কথাও শোকবার্তায় তুলে ধরলেন তৃণমূলনেত্রী।
তৃণমূলের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের একটি সূত্রে খবর, বিধানসভায় বিধায়ক মুকুলের দেহ নিয়ে যাওয়া হবে। তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে উপস্থিত থাকবেন অভিষেক। মুকুলের মৃত্যুতে শোকবার্তা দিয়েছেন তাঁর আর এক রাজনৈতিক সহকর্মী, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও। বিজেপি পরিষদীয় দলের তরফে বিধানসভায় কৃষ্ণনগর উত্তরের বিধায়ককে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন ময়নার বিধায়ক অশোক দিন্ডা, জয়পুরের বিধায়ক তথা প্রাক্তন সাংসদ নরহরি মাহাতো এবং ভাটপাড়ার বিধায়ক পবন সিংহ।
মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘‘ওঁর সহসা প্রয়াণের সংবাদে বিচলিত ও মর্মাহত বোধ করছি। তিনি আমার দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন, বহু রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর বিদায়ের খবর আমাকে বেদনাহত করেছে।’’
মুখ্যমন্ত্রী এ-ও জানান, মুকুল তৃণমূলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ‘প্রাণপাত’ করেছেন। দলের সর্বস্তরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। পরে তিনি ‘ভিন্ন পথে’ চলে গেলেও আবার ফিরে আসেন। মমতা লেখেন, ‘‘বাংলার রাজনীতিতে তাঁর অবদান এবং সাংগঠনিক দক্ষতার কথা ভোলার নয়। দলমত নির্বিশেষে তাঁর অভাব অনুভব করবে রাজনৈতিক মহল।’’
প্রয়াত বিধায়ককে ‘অভিজ্ঞ নেতা’ এবং ‘সহকর্মী’ বলে উল্লেখ করে মুকুল-পুত্র শুভ্রাংশু রায়কে সমবেদনা জানিয়েছেন মমতা। তাঁর বার্তা, ‘‘মন শক্ত করো: এই সঙ্কটে আমরা তোমার সঙ্গে আছি।’’
মুকুলের সঙ্গে মমতার পরিচয় নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়। দু’জনেই তখন কংগ্রেসে। ১৯৯৭ সালে যখন তৃণমূল গঠনের নথিপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা পড়েছে, তখন নতুন দলটির প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হন মুকুল-ই। তৃণমূলে মুকুলের অবস্থান ছিল মমতার পরেই। ২০০৬ সালে মুকুলকে রাজ্যসভায় পাঠানো থেকে দীনেশ ত্রিবেদীকে সরিয়ে রেলমন্ত্রীর চেয়ারে বসানো, সবেতেই মমতার আস্থার প্রকাশ দেখা গিয়েছে। কিন্তু সারদাকাণ্ডের পর থেকে তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে মুকুলের। ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। তার আগে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ এবং সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ছিলেন। পদ্মশিবিরে গিয়ে তাদের সংগঠন মজবুত করতে হাত লাগান মুকুল। ওই সময়ের মুকুলের হাত ধরে তৃণমূল থেকে অনেকেই বিজেপিতে চলে যান। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপি ১৮টা আসন পাওয়ার পর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে আরও গুরুত্ব পান মুকুল। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তাঁকে প্রার্থীও করে বিজেপি। শোনা যায়, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সেই সময় একটি নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মুকুলের জন্য ‘দুঃখপ্রকাশ’ করেন মমতা।
সাড়ে তিন বছর পর ‘পুরনো ঘরে’ ফেরেন বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি মুকুল। তৃণমূল ভবনে দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে সপুত্র ঘাসফুল শিবিরে ফিরে আসেন। সে দিন ‘ঘরের ছেলে’ বলে মুকুলকে স্বাগত জানিয়েছিলেন মমতা। আর অভিষেকের হাত থেকে উত্তরীয় পরে মুকুল বলেছিলেন, ‘‘বিজেপি থেকে বেরিয়ে খুব ভাল লাগছে। নতুন আঙিনায় এসেছি, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে... আর এটা ভেবে ভাল লাগছে, বাংলা আবার তার নিজের জায়গায় ফিরবে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন মমতা।’’
তবে তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন করলেও পুরনো জায়গা আর ফিরে পাননি মুকুল। বিধানসভার ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি’র চেয়ারম্যান হয়েছিলেন বটে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই পদত্যাগ করেছিলেন। স্ত্রী কৃষ্ণা রায়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন। নিজেও অসুস্থ ছিলেন। তার পর থেকেই তাঁর কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখা যেতে থাকে। বীরভূমে একটি সভার পরে অনুব্রত মণ্ডলকে পাশে দাঁড়িয়ে মুকুলের মন্তব্য, ‘ভারতীয় জনতা পার্টি মানেই তৃণমূল’ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। মাঝে এক বার নিজেই দিল্লি চলে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিজেপিতে ফিরতে চান।
জীবনের শেষ কয়েক মাস কাঁচরাপাড়ার বাড়িতে থাকতেন মুকুল। বেরোনো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কোমায় চলে গিয়েছিলেন। রবিবার গভীর রাতে মৃত্যু হয় মুকুলের।