শনিবার ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
বাংলায় কথা বলার জন্য ভিন্রাজ্যে হেনস্থা হতে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে। আবার পশ্চিমবঙ্গকে ‘দখল’ করার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠান থেকে নাম-না করে বিজেপি-কে ‘হ্যাংলা’ বলে কটাক্ষ করলেন তৃণমূলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি, পরামর্শের সুরে পদ্মশিবিরকে বলেছেন, ‘‘গায়ের জোরে মন জয় করা যায় না। আগে বাংলা শুনুন, জানুন, শিখুন।’’
সামনেই রাজ্যের বিধানসভা ভোট। তার আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) থেকে ভিন্রাজ্যে বাংলাভাষী মানুষদের বাংলাদেশি সন্দেহে হয়রানির অভিযোগকে ইস্যু করেছে তৃণমূল। কলকাতায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপনী অনুষ্ঠান থেকে ওই সমস্ত বিষয়কে ছুঁয়ে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী। কখনও বিজেপিকে নিশানা করে তিনি বলেছেন, ‘‘আমগাছে আম হয়, আমড়া হয় না।’’ কখনও কটাক্ষ করে ‘বাচ্চা’র সঙ্গে তুলনা করেন। মমতার কথায়, ‘‘ছোটরা আড়ি করে। তারা বলে ফুচকা খাব। চকোলেট খাব। লজেন্স খাব। বাচ্চারা বলতেই পারে। এটা তাদের অভ্যাস। তখন মায়েরা বলে, ‘তুই এত হ্যাংলা কেন রে?’ আমার ওদের দেখে মনে হয়, বাংলার জন্য বড্ড বেশি হ্যাংলা!’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বাংলাকে জোর করে দখল করতে চায়। জবরদস্তি, বুলডোজ় করতে চায়। (কিন্তু) এটা হচ্ছে না, হবে না। আগে মানুষকে ভালবাসতে শিখুন। বিশ্বাস করতে শিখুন। গায়ের জোরে মন জয় করা যায় না।’’
একুশে ফেব্রুয়ারির মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মাতৃভাষার উপর আঘাত এলেই সকলকে রুখে দাঁড়াতে হয়। যে বাংলা ভাষার জন্য মানুষ শহিদ হতে পারে, সেই ভাষায় কথা বলার জন্য ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দেওয়া হবে, এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। বস্তুত, বিগত বেশ কিছু দিন ধরে ওড়িশা থেকে বিহার, দিল্লি থেকে ঝাড়খণ্ড, বিজেপি এবং অবিজেপি শাসিত বেশ কিছু রাজ্যে বাংলায় কথা বলার জন্য বাংলাভাষী বলে আক্রমণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভাষার জন্য আক্রমণের শিকার হয়ে কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন অনেক পরিযায়ী শ্রমিক। ভাষা দিবসের মঞ্চ থেকে ওই ঘটনাগুলির নিন্দা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দেওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দাবিকে আবার নস্যাৎ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘বাংলা কারও কাছে মাথানত করে না। দিল্লি থেকে এসে বাংলা দখল করাও যায় না। বাংলাটাকে আগে চিনতে হয়। এখানে এসে কি মাছ খাওয়া, মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবেন? শাড়ি পরাও বন্ধ করে দেবেন নাকি!’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সারা দেশে একনায়কতন্ত্র চলছে। স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে সকলে তৈরি হোন। দুর্যোধন, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাংলা থাকবে মাথা উঁচু করে।’’
মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাখ্যা, মাতৃভাষা দিবসের উদ্যাপন মানে শুধুই বাংলা ভাষার উদ্যাপন নয়। সমস্ত ভাষাকে সম্মান জানানোর দিন। তিনি বলেন, ‘‘যে কোনও ভাষার উপর আঘাত এলে আমরা রুখে দাঁড়াব। দয়া করে আমাদের ভাষাকে অসম্মান করবেন না। আমি অনেক জায়গায় দেখছি, বাংলায় কথা বললে অনুপ্রবেশকারী তকমা দিয়ে অত্যাচার করা হচ্ছে। দেশটা তো ভারতবর্ষ। এ রাজ্যে আড়াই কোটি মানুষ বাইরের রাজ্যের। তাঁদের আমরা ভাই-বোনের মতো ভালবাসি। আমাদের লোকেরা কী অপরাধ করল? বাংলা ভাষায় কথা বলা কি অপরাধ?’’
মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে পশ্চিমবাংলার মানুষকে হয়রানি করছেন। তাঁর দাবি, এসআইআরের মাধ্যমেও পশ্চিমবাংলার মানুষের অধিকার কাড়ার চেষ্টা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘পার্টিকুলার বিধর্মী, বাংলাবিদ্বেষী কিছু লোকজনকে বলছি, বাংলা ভাষা আপনাদের দয়ায় আসেনি। বাংলার সংস্কৃতিকে হরণ করা যায় না। বাংলাকে গায়ের জোরে দখলও করা যাবে না।’’