Mamata Banerjee

শুনানি-হয়রানি: দরকারে নিজে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে মানুষের হয়ে সওয়াল, বললেন মমতা! শীর্ষ আদালতে মামলা রুজু তৃণমূলের

মমতা জানান, রাজ্যে এসআইআরের পরে খসড়া তালিকায় ৫৪ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। ‘খুনিদেরও’ নিজেদের হয়ে সওয়াল করার অধিকার রয়েছে। তিনি মানুষের হেনস্থা নিয়ে সওয়াল করবেন।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৩৫
Share:

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।

রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন বলে সোমবার গঙ্গাসাগরের এক কর্মসূচিতে জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, এসআইআরের শুনানিতে মানুষ হেনস্থার শিকার হচ্ছেন। প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের হয়ে সওয়াল করবেন তিনি। আইনজীবী হয়ে নয়, সাধারণ নাগরিক হিসাবে কথা বলবেন। নেত্রীর এই বক্তব্যের পরেই সুপ্রিম কোর্টে এসআইআরের শুনানিতে মানুষের হেনস্থা নিয়ে মামলা রুজু করেন তৃণমূলের সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের হয়ে এই মামলা করেছেন তিনি। সেখানে আবেদনকারী হলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেন।

Advertisement

সোমবার গঙ্গাসাগর সেতুর শিলান্যাস করেন মমতা। তার পরেই তিনি এসআইআরের শুনানির সময়ে সাধারণ মানুষের হেনস্থা নিয়ে সরব হন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যে এসআইআরের পরে খসড়া তালিকায় ৫৪ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। ‘খুনিদেরও’ নিজেদের হয়ে সওয়াল করার অধিকার রয়েছে। এখন এআই (কৃত্রিম মেধা)-এর মাধ্যমে ঠিক করা হচ্ছে কার নাম বাদ যাবে, কার থাকবে। তার পরেই মমতা জানান, তিনি আদালতের দ্বারস্থ হবেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরাও আইনের সাহায্য নিচ্ছি। আগামী কাল (মঙ্গলবার) কোর্ট খুলবে। আমরাও আদালতে যাব। এত মানুষের মৃত্যু, এত মানুষকে যে ভাবে হেনস্থা করছে, তার বিরুদ্ধে আদালতে যাব।’’

এর পরেই মমতা জানান, প্রয়োজনে তিনি নিজেও সওয়াল করবেন। তিনি বলেন, ‘‘প্রয়োজন পড়লে নিজেও অনুমতি চাইব। দরকার হলে আমিও সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে মানুষের হয়ে প্লিড করব। মানুষের হয়ে কথা বলব। আমি আইনজীবী। কিন্তু আইনজীবী হয়ে যাব না। সাধারণ নাগরিক হিসাবে যাব। আমি আমার কথা বলতেই পারি। কথা বলার অনুমতি নেব। চোখে আঙুল দিয়ে দেখাব, তৃণমূল স্তরে কী চলছে, কী ভাবে মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে।’’

Advertisement

প্রসঙ্গত, এসআইআর নিয়ে তৃণমূল যে মামলা করবে, তার প্রস্তুতি চলছিল। জমি তৈরি করছিল রাজ্যের শাসকদল। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। সেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে অভিষেকের ‘মুখোমুখি লড়াই’ বেধে যায় বলে খবর। রবিবার কমিশনকে তৃতীয় বার চিঠি দেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সাংবিধানিক পদকে সেই চিঠি দেন তিনি। সাড়ে তিন পাতার চিঠিতে তিনি এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে জানান, এগুলির সমাধান না-হলে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ হয়ে যাবে। বহু বৈধ ভোটার ভোটাধিকার হারাবেন বলেও আশঙ্কাপ্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূলের একটি সূত্র বলছে, এই বিষয়গুলিকে মামলায় নথি হিসাবে দেখাতে চাইছেন নেতৃত্ব। তার আগে সোমবার মমতা জানিয়ে দিলেন, মানুষের হয়ে আদালতে সওয়াল করবেন তিনি।

এসআইআরের প্রক্রিয়ার দিকেও আঙুল তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘এআই দিয়ে ঠিক করছে, কার পদবি বদলেছে, কে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন। হোয়াট্‌সঅ্যাপে নির্বাচন কমিশন চলছে। হোয়াট্স‌অ্যাপ কিনে নিয়েছে নাকি কে জানে!’’ তার পরেই নাম না করে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘ভ্যানিশ করছে মানুষের নাম। মানুষের অধিকার ভ্যানিশ হলে আপনারাও ভ্যানিশ হবেন। এ লড়াই বাঁচার লড়াই।’’ প্রসঙ্গত, অভিষেকের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল কমিশনের দ্বারস্থ হয়ে ১০টি প্রশ্ন করেছিল। তার মধ্যে তাদের অন্যতম প্রশ্ন ছিল, লিখিত নির্দেশিকা না-দিয়ে হোয়াটস্‌অ্যাপে কেন নোট চালাচালি হচ্ছে। সেই কথাই শোনা গেল সোমবার মমতার গলায়। তিনি জ্ঞানেশকে আবার ‘ভ্যানিশ’ সম্বোধন করে বলেন, ‘‘ভ্যানিশ কুমার, বাংলায় কোনও ডিটেনশন ক্যাম্প হবে না! বিচার মানুষ দেবে।’’

এর পরেই মমতা অভিযোগ করেন, এসআইআরের শুনানিতে হেনস্থা করা হচ্ছে মানুষকে। তিনি বলেন, ‘‘বয়স্ক লোকেরা নাকে অক্সিজেন মাস্ক নিয়ে যাচ্ছেন শুনানিতে। কারও ৮৫ বছর বয়স। অন্তঃসত্ত্বাকেও ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। এত দিন পরে প্রমাণ করতে হবে, এ দেশের নাগরিক কি না।’’ মমতার প্রশ্ন, ওবিসি, এসসি, এসটি শংসাপত্র নথি হিসাবে কেন গৃহীত হবে না। আধার কার্ড কেন নথি হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়, সেই প্রশ্নও তিনি করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আধার কার্ডের ফোটো তুলতে ১০০০ টাকা নিয়েছিল। আজ আধার নো স্যর! শংসাপত্র, ঠিকানা প্রমাণ হবে না! তা হলে কী চলবে? তোমরাও অচল।’’ তিনি জানান, বিয়ের পর কোনও মহিলার পদবি পরিবর্তন করা অপরাধ নয়। তবুও পদবি বদলানোর কারণে ভোটার তালিকা থেকে মহিলাদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। বিয়ের পর যেহেতু ঠিকানা বদলে যায়, তাই তাঁদের নাম মুছে ফেলা হচ্ছে। এমনকি ইংরেজি ও বাংলা বানানের সামান্য অমিলের কারণেও নাম কাটা যাচ্ছে। জাতিগত শংসাপত্রের মতো সরকার প্রদত্ত নথিগুলোকেও মান্যতা দেওয়া হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রী নাম না-করে বিজেপিকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘আগামী দিনে মানুষ ওদের অচল করবেন।’’

মমতার মতে, এসআইআর হোক দু’বছর সময় নিয়ে। ‘গায়ের জোরে’ কেন হবে? তাঁর কথায়, ‘‘রাজ্যে ৭০ জন মারা গিয়েছেন। অনেকে সুইসাইড করতে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি। এক বারও মন কাঁদে না? এক বার আপনার মাকে অ্যাম্বুল্যান্সে নিয়ে গেলে দিল্লির লাড্ডুরা কী উত্তর দিত?’’ এর পরে বিজেপির বিরুদ্ধে আরও সুর চড়িয়েছেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘দিল্লির নেতাদের নেতা বলেছেন, লক্ষ্মীদের বাড়ি থেকে বার হতে দেবেন না ভোটের দিন। বন্দি করবে রাখবেন। আমি বলি, লক্ষ্মীদের তো চেনো না। এরা পাঁচালি যেমন পড়ে, রান্না করে, শিল্প করে, ছেলেদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সৃষ্টি করে। মহিলারা কারও মা, কারও বোন, কারও মাসি। ওরা শাসানি দিচ্ছে। এত বড় ক্রিমিনাল অফেন্স!’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘দুর্যোধন, দুঃশাসন আপনার চোখে রক্তের আগুন দেখান! আমরা বসন্তের ফাগুন দেখাব। পলাশের খেলা দেখাব। বিচার মানুষ দেবে। অপেক্ষা করুন। জন আদালত। গণ আদালত।’’ তিনি বিজেপির নাম না করে এ-ও বলেন, ‘‘ওরা নাকি ধর্ম মানে। বিধর্ম। শ্রীকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন, ধর্ম মানে ধারণ। ধর্ম মানে কী? ধর্ম মানে মানবতা, পবিত্রতা। ধর্ম মানে শান্তি। এটা বলেন শ্রীকৃষ্ণ। গীতাকে অপমান করে, উন্নয়নের পাঁচালি নিয়ে চাঁচালি করে। যায় আসে না।’’ মমতা আরও জানান, এটা নির্বাচনের বছর। ওরা সমস্যা তৈরির চেষ্টা করছে এবং ছোট ঘটনাকে বড় করে দেখানোর ফন্দি আঁটছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে যে অন্যায় হচ্ছে, তা নিয়ে মুখ খোলা যাচ্ছে না। ওড়িশায় বাঙালিদের উপর অত্যাচার করা হয়েছে, অথচ কিছু বলতে পারা যাবে না। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য মানুষকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী আদালতের দ্বারস্থ হবেন জানানোর পরেই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্টে লড়তে চাইলে লড়ুন, যা করার ওখানে গিয়ে করুন। বাংলার মানুষকে উত্ত্যক্ত করবেন না।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement