West Bengal Budget 2026

‘বিরোধীদের কিছু আর বলার রয়েছে বলে মনে হয় না’! বাজেট নিয়ে উচ্ছ্বসিত শুভেন্দু, উল্লেখ করলেন সরকারি দিশার

শুভেন্দু জানিয়েছেন, তাঁর সরকারের বাজেটে সেবা, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি— পাঁচটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য, হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি, গরিমা ফেরানোর উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ ১৭:০৩
Share:

শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: সংগৃহীত।

এমন কিছু আর নেই, যা বাজেট থেকে বাদ গিয়েছে। এই বাজেট নিয়ে বিরোধীদেরও কিছু বলার আছে বলে মনে হয় না। সোমবার পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করার পরে এমন মন্তব্যই করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন, এটা শুধু তাঁর কথা নয়। তৃণমূলের বিধায়ক অশোক দেবও তাঁকে একই কথা জানিয়েছেন। বর্তমান সরকারের বাজেটের মূল দিশা কী, সোমবার তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন শুভেন্দু। এই বাজেটকে পূর্ণাঙ্গ বলা যায় কি না, সেই প্রশ্নও তুলেথেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, এটা আট মাসের বাজেট, ১২ মাসের নয়! তাঁর আশ্বাস, এই বাজেটে যদি কিছু বাদ পড়েও যায়, তা হলে পরের বাজেটে তা নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্য দিকে, তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ জানিয়েছেন, নতুন সরকারকে কিছুটা সময় দিতে চান তাঁরা। কুণালের দাবি, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘আত্মনির্ভর’ বাজেট করতে হত, সেখানে এই বাজেট কেন্দ্রীয় সরকার-নির্ভর।

Advertisement

সোমবার বিধানসভায় বাজেট পেশ করেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। তার পরেই তাঁকে এবং রাজ্যের অর্থ দফতরের প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মণকে পাশে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। সেখানে তিনি প্রথমেই জানান, সোমবার পেশ করা বাজেটকে তিনি পূর্ণাঙ্গ বলবেন না। কারণ এই বাজেট অগস্ট থেকে আগামী মার্চ পর্যন্ত। তবে তাঁর বক্তব্য, এই বাজেটে কোনও ফাঁকফোকর নেই। তিনি বলেন, ‘‘এই বাজেটে এমন কোনও অংশ নেই, যেটা বাদ গিয়েছে! বিরোধীদের কিছু বলার আছে বলেও মনে হয় না।’’ তিনি জানান, বিরোধী দলের বিধায়ক অশোকও তাঁকে একই কথা বলেছেন, সঙ্গে একটা আর্জিও জানিয়েছেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘বিরোধী দলের এক প্রবীণ বিধায়ক, বহু বারের বিধায়ক, অশোক দেব আমাকে বলছিলেন, (বাজেট নিয়ে) বলার কোনও সুযোগ নেই। আইনজীবীদের জন্য কিছু থাকলে ভাল হত।’’ শুভেন্দু আশ্বাস দিয়েছেন, রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন তাঁর দফতরের সঙ্গে আলোচনা করবেন এই নিয়ে। দু’দিন তিনি জবাবি ভাষণ দেবেন। সেখানে সম্ভব হলে কিছু ব্যবস্থা করতেও পারেন।

শুভেন্দু জানিয়েছেন, তাঁর সরকারের বাজেটে সেবা, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি— পাঁচটি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য, হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি, গরিমা ফেরানোর উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। বাজেটে ‘সময়ের ডাক’ অর্থাৎ প্রাসঙ্গিকতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সুরক্ষা, নাগরিকদের মর্যাদা, ভয়মুক্ত পরিবেশ, সংস্কৃতির পুনরুত্থান, কর্মসংস্থানকে। তাঁর কথায়, ‘‘উল্লেখযোগ্য ভাবে বাজেটে গুরুত্ব দিয়েছি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে। এই রাজ্যে যাঁরা সেবা দান করেন, আংশিক সময়ের চুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত, সর্বোপরি সরকারি সিদ্ধান্ত নীতি কার্যকর করতে যে সরকারি কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন— তাঁদের উল্লেখ রয়েছে (বাজেটে)।’’

Advertisement

তার পরেই মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, রাজ্যে শিল্পের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। আইনশৃঙ্খলা সুদৃঢ় করে, চাঁদাবাজি, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট বন্ধ করে, ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্প, ব্যবসার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হবে রাজ্যে। তাঁর কথায়, ‘‘১০০ কোটি টাকার বেশি যাঁরা বিনিয়োগ করবেন, তাঁদের পঞ্চায়েত বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে না। স্থানীয় স্তরে হয়রানির শিকার থেকে মুক্তি পাবেন।’’ আগের সরকার যে ‘ইনসেনটিভ’ ব্যবস্থা তুলে দিয়েছিল, এই সরকার তা ফিরিয়েছে এনেছে। ৫০০০ কোটি টাকার প্রভিশন রাখা হয়েছে। ব্যবসা, ভর্তুকি সংক্রান্ত ট্রেনিং নিয়ে যাঁরা নিজের ব্যবসা করতে চান, তাঁদের দায়িত্ব অনেকটাই নিয়েছে রাজ্য, আশ্বাস শুভেন্দুর। তিনি আরও জানিয়েছেন, সড়ক, সেতু, রেলপথ, বিমান, সমুদ্র বন্দর তৈরির করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিও ঘটানো হবে।

কৃষিক্ষেত্রে এই বাজেটে কী কী বরাদ্দ হয়েছে, তা-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি জানিয়েছেন, কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ২ টাকা করে ছাড় দেবে সরকার। এ জন্য ৮০০ কোটি টাকা খরচ হবে রাজ্য সরকারের। আলুচাষি, ধানচাষিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরেছেন। শুভেন্দু জানিয়েছেন, অক্টোবর থেকে স্নাতক পাশ করা যুবকেরা মাসে তিন হাজার টাকা পাবেন। যাঁরা স্নাতক পাশ করেননি, তাঁরা ২০০০ টাকা পাবেন। তা নিয়ে গাইডলাইন প্রকাশ করা হবে। তবে যাদের পরিবারের আয় মাসে এক লক্ষ টাকা বা তার বেশি, তাঁরা এই সুবিধা পাবেন না।

মহিলাদের জন্য প্রকল্পের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে শুভেন্দু জানান, পূর্বতন সরকারের আমলে দুর্নীতি হয়েছে। আশা, আইসিডিএস কর্মীরা আগের সরকারের কাছে তাঁদের সাম্মানিক ৪,০০০ টাকা বৃদ্ধি করার দাবি করেছিলেন। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘আগের মুখ্যমন্ত্রী লাঠি মেরেছিলেন। এই সরকারের কাছে না চাইতেও পেয়েছেন। আপনারা অনেক কাজ করেন। স্বাস্থ্যক্ষেত্র বাঁচিয়ে রেখেছেন। সেন্টার চালানোর পাশাপাশি সরকারকে সাহায্য করেন।’’ প্যারা-টিচারদেরও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

এর পরেই শুভেন্দু হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সিভিক ভলান্টিয়ারদের। তাঁর কথায়, ‘‘ভুয়ো নিয়োগ হয়েছে। সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ— জল মেশানো। যোগ্যতা নেই। অনেকের শিক্ষাগত শংসাপত্র ভুয়ো। অনেকে পার্টির ক্যাডারের কাজ করেন। কারও বয়সের শংসাপত্র ভুয়ো। ২০০০ টাকা বাড়িয়েছি। ঝাড়াইবাছাই হবে। ছাঁটাই হবে না।’’ সরকারি হাসপাতালে রোগী পিছু খাবারের জন্য বরাদ্দ ৫৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১০ টাকা করা হয়েছে, সে কথাও জানিয়েছে শুভেন্দু।

মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, কোন পথে চলবে রাজ্য। তাঁর কথায়, ‘‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দেখানো পথেই বাংলা চলবে। বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম, ইস্কনের পথে বাংলা চলবে। সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুতি ঘটবে না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করপাস ফান্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। ইস্কনকে মিডডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আপত্তি থাকলে হরেকৃষ্ণ বলবেন না। জোর করব না। শুদ্ধ খাবার পাবেন।’’ তার পরেই মুখ্যমন্ত্রী আরও এক বার জানান, অল্প দিনের মধ্যে ‘সুন্দর, ইনক্লুসিভ’ বাজেট পেশ করেছে তাঁর সরকার। তাঁর কথায়, ‘‘অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কথা বলা নেই। অতিরিক্ত ঘাটতিও নেই। সামান্য এক-দু’ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।’’

এই প্রসঙ্গেই কটাক্ষ করেছেন তৃণমূল নেতা কুণাল। তিনি বলেন, ‘‘এখানে খরচের কথা বলা হয়েছে, টাকা কোথা থেকে আসবে, সরকারের আয় কী, তা পুস্তিকায় স্পষ্ট নয়। ব্যয় করছে সরকার, আয় কোথা থেকে! কেন্দ্রীয় সরকার নির্ভর বাজেট। ভাল-মন্দ কোনওটাই বলছি না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বইটির মধ্যে এত বার কেন্দ্রীয় সরকারের উল্লেখ রয়েছে, বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছিল যে রাজ্য বাজেট শুনছি, না কি কেন্দ্রীয় বাজেটের রাজ্য সংস্করণ শুনছি।’’ তবে কুণাল জানিয়েছেন, নতুন সরকারকে তাঁরা সময় দিতে চান। সেই সঙ্গে এ-ও জানান, যে ভাতা মমতার সরকার চালু করেছিল, এ বার তাদের বাজেটেও তা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement