ছবি পিটিআই।
সংক্রমণ বৃদ্ধির সূচকে নতুন রেকর্ড স্পর্শ করল বঙ্গ। মাত্র এগারো দিনের ব্যবধানে এক দিনে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হল বৃহস্পতিবার। গত ৫ জুলাই এই সংখ্যা ছিল ৮৯৫। এ দিন স্বাস্থ্য দফতরের প্রকাশিত বুলেটিন অনুযায়ী, গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে ১৬৯০ জন সংক্রমিত হয়েছেন। এক দিনে কোভিড পজ়িটিভ রোগীর মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের।
সংক্রমণের মানচিত্রে কলকাতার (৪৯৬) পরে যে জেলার দাপট সবচেয়ে বেশি তা হল উত্তর ২৪ পরগনা (৪০৩)। সাড়ে তিনশোর ঘর টপকে এ দিন সংক্রমণের সংখ্যা সেই জেলায় চারশোর গণ্ডি অতিক্রম করেছে। বুধবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্নে জানিয়েছিলেন, টেস্ট বাড়ার কারণে আগামী ক’দিন রাজ্যে সংক্রমণ বাড়বে। তা-ই হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যে মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৩১৮০টি। যার প্রেক্ষিতে কালিম্পং বাদে হাওড়া (১৮৩), দক্ষিণ ২৪ পরগনা (১৪৬), হুগলি (৮১)-সহ বঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি আক্রান্তের হদিস মিলেছে।
বাংলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা এখন ৩৬১১৭ হলেও, এ দিনের পরে অ্যাক্টিভ কেসের সংখ্যা হল ১৩,৬৭৯ জন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে নমুনা-পিছু আক্রান্তের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্য দিকে, সুস্থতার হার কমছে। করোনা বুলেটিন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের ৩-৭ তারিখ রাজ্যে গড় সুস্থতার হার ছিল ৬৬ শতাংশ। জুলাইয়ের ৮ তারিখ তা কমে হয় ৬৫.৬২ শতাংশ। এর পর তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। গত চার দিন এই হার ছিল যথাক্রমে, ৬১.০৯, ৬০.৬৯, ৬০.০৬ ও ৫৯.২৯ শতাংশ।
উল্টো দিকে রয়েছে নমুনা পরীক্ষার নিরিখে আক্রান্তের হার। সেখানে ঊর্ধ্বমুখী হার লক্ষ করা যাচ্ছে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে যেখানে পজ়িটিভিটি রেট চার শতাংশের আশেপাশে ছিল, এখন তা পাঁচ শতাংশের বেশি। এদিনের বুলেটিন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, টেস্ট পজ়িটিভিটির হার হল ৫.৪৫ শতাংশ। গত চার দিনের টেস্ট পজ়িটিভিটি হার যথাক্রমে, ৫.০১, ৫.১৪, ৫.৩০ এবং ৫.৪৫ শতাংশ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অনির্বাণ দলুইয়ের মতে, নমুনা পরীক্ষার নিরিখে আক্রান্তের হার বৃদ্ধিকে দু’ভাবে দেখা যায়। প্রথমত, সত্যিই যাঁরা আক্রান্ত তাঁদের এখন খোঁজ মিলছে। জনস্বাস্থ্যের পরিভাষায় যাঁদের বলা হয়, ‘মিসিং কেস’। পাশাপাশি, মাস তিনেক আগে পরিস্থিতি যা ছিল তার তুলনায় সংক্রমণের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই সম্ভাবনাও ওড়ানো যায় না। ডিসচার্জ রেট বা সুস্থতার হার আগের তুলনায় কমেছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘‘এর অর্থ হাসপাতালে রোগীরা বেশি দিন ধরে থাকছেন।’’ অনেক ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ পরেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে, এমন ঘটনা ঘটছে। তাঁর কথায়, ‘‘ভাইরাসের প্রভাব বৃদ্ধি এর একটা কারণ হতে পরে। তবে এ সবই সম্ভাবনা। জনসংখ্যার সমানুপাতিক হারে নমুনা পরীক্ষা এবং ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ ছাড়া নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়।’’
সংক্রামক রোগের চিকিৎসক যোগীরাজ রায় জানান, টেস্ট পজ়িটিভি রেট বা ডিসচার্জ রেট বৃদ্ধির মধ্যে উদ্বেগের কারণ নেই। তাঁর কথায়, ‘‘সংক্রমণের মোকাবিলায় আমরা যে ঠিক পথে এগোচ্ছি এই তথ্য তারই প্রমাণ।’’ তিনি জানান, নমুনা পরীক্ষার নিরিখে পজ়িটিভিটি বাড়ছে মানে সংক্রমণের বৃদ্ধি ঘটছে। তাঁর কথায়, ‘‘এটা কেন হচ্ছে তা নির্দিষ্ট কোনও মাপকাঠি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।’’ এ ধরনের পদক্ষেপের প্রশংসা করা উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘এখন এক জন আক্রান্ত গড়ে আট-দশ দিন হাসপাতালে থাকছেন। সেই সময়ের মধ্যে কেসের সংখ্যাও তো বাড়ছে। ফলে ডিসচার্জ রেট তো কমবেই। সে জন্যই তো শয্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’’
প্রসঙ্গত, বুধবারই এনআরএসে ১১০ শয্যার কোভিড ব্লক চালু করতে সম্মতি দিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন। এ দিন আর আহমেদ ডেন্টাল কলেজ কর্তৃপক্ষ ওপিডি ওয়েটিং হল-সহ নতুন বিল্ডিংয়ের চার এবং ছ’তলা মিলিয়ে মৃদু উপসর্গ এবং উপসর্গহীন অন্তত ৩০০ কোভিড পজ়িটিভ রোগীকে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলে স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগমকে জানিয়েছেন। ডেন্টাল কলেজের যে হেতু ভেন্টিলেটর-যুক্ত অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে তাই প্রয়োজনে কলকাতা মেডিক্যাল, এনআরএস বা বেলেঘাটা আইডি’তে রোগীকে স্থানান্তর করতেও অসুবিধা হবে না।
সংক্রমণ বৃদ্ধির মধ্যে স্বাস্থ্য দফতরের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী বলেন, ‘‘শয্যা বৃদ্ধি, অক্সিজেন বেড, সিসিইউয়ের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ানোর কাজ চলছে। রোগী প্রত্যাখ্যান যাতে না হয়, সে জন্য সময়মতো হাসপাতালের বেড খালির বিষয়টিও পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। পাশাপাশি, করোনা পজ়িটিভ রোগীদের থেকে যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়, সেটা নিশ্চিত করা এখন মূল লক্ষ্য। তার জন্য উপসর্গের মাত্রার নিরিখে আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি, হোম আইসোলেশন বা সেফ হাউস, যে কোনও উপায়ে আলাদা করার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।’’
উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল সম্পর্কিত যাবতীয় আপডেট পেতে রেজিস্টার করুন এখানে