লিজার ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে ‘ডেঙ্গি ফিভার উইথ শক’ (চিহ্নিত)।
আগের জন ছিলেন দুর্গাপুরের মেয়ে, আক্রান্ত হয়েছিলেন কলকাতায়। এ বারও শিকার দুর্গাপুরেরই বালিকা। রাজ্যে ফের প্রাণ নিল ডেঙ্গি।
দুর্গাপুরের মেনগেট এলাকার লিজা সূত্রধরকে (৮) সোমবার বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। মঙ্গলবার তার মৃত্যু হয়। ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে ‘ডেঙ্গি ফিভার উইথ শক’।
অভিযোগ, ইদানীং রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গিতে কেউ মারা গেলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লিখে দেওয়া হচ্ছে, জ্বরের রোগীর মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। অনেক সময়ে এমনকী ‘হেমারেজিক ডেঙ্গি’র ক্ষেত্রেও লেখা হয়েছে, মৃত্যুর কারণ জ্বর থেকে রক্তক্ষরণ। ‘ডেঙ্গি’ শব্দটি সযত্নে বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরজীবী বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, যে কোনও সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে মূল ভিত্তি সঠিক পরিসংখ্যান। কোথায় রোগটি সংক্রমিত হচ্ছে তা জানা থাকলে নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা তৈরি করা যায়। মৃত্যুহার কমিয়ে দেখালে, সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে, মোকাবিলায় ঘাটতি থেকে যায়। স্বাস্থ্য ভবনের এক কর্তা অবশ্য বুধবার দাবি করেন, ‘‘বিভিন্ন হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসাররা ডেঙ্গি সংক্রমণের সঠিক চিত্রটাই তুলে ধরেছেন।’’
শুধু হাসপাতাল থেকে দেওয়া ডেথ সার্টিফিকেটে কারচুপি করা নয়, কোথাও ডেঙ্গিতে কারও মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট পুরসভা বা পঞ্চায়েত দায় নিতে চাইছে না বলেও অভিযোগ। কলকাতায় বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, ডেথ সার্টিফিকেটে ডেঙ্গি সংক্রমণের কথা লেখা হলেও কলকাতা পুরসভা তা মানতে চায়নি। আবার দুর্গাপুর পুরসভা ডেঙ্গিতে লিজার মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও পুর এলাকাতেই মেয়েটি ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন পুর কর্তৃপক্ষ। দুর্গাপুরের মেয়র অপূর্ব মুখোপাধ্যায় বুধবার বলেন, ‘‘মেডিক্যাল কলেজ যখন ডেঙ্গিতে মৃত্যুর কথা বলেছে, তখন নিশ্চয়ই তাই ঘটেছে। কিন্তু আমাদের ধন্দ অন্য। মেয়েটি কোথায় আক্রান্ত হয়েছে, তা খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।’’
দুর্গাপুর পুরসভার মেডিক্যাল অফিসার ঈশানী দাশগুপ্তের কথায় কিন্তু অন্য সুর বাজছে। তিনি জানান, এ বছর প্রতি মাসেই শহরের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কয়েক জন করে ডেঙ্গি আক্রান্তের খবর মিলেছে। তবে মৃত্যুর ঘটনা এই প্রথম। লিজার বাবা গৌতম সূত্রধর জানাচ্ছেন, ‘‘আমার মেয়ে ইদানীং দুর্গাপুরের বাইরে যায়নি।’’
সম্প্রতি দুর্গাপুর থেকে কলকাতায় ডাক্তারি পড়তে যাওয়া মালিনী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয় ডেঙ্গিতে। তিনি আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ হস্টেলে থাকতেন। লিজার এক পড়শির অভিযোগ, কলকাতা হোক বা দুর্গাপুর, ঠিক সময়ে রোগ ধরা না পড়াতেই অসুস্থতা মারাত্মক আকার নিচ্ছে। লিজার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।
লিজার রোগ নির্ণয়েও গোড়ায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ঈশানী দাশগুপ্তের বক্তব্য, ‘‘আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই মেয়েটির রক্ত পরীক্ষা করানো হয়েছিল। কিন্তু অনেক সময়ে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে কিছুটা সময় নেয়। হয়তো সে কারণেই আইজিএম এবং আইজিজি নেগেটিভ এসেছিল। পরে বাঁকুড়া হাসপাতালের পরীক্ষায় হয়তো তা পজিটিভ আসে।’’ পরজীবী বিশেষজ্ঞদের অনেকে অবশ্য এর জন্য স্বাস্থ্য দফতরকেই দুষছেন। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘‘আমরা বরাবর জ্বর হওয়ার প্রথম দু’তিন দিনের মধ্যে এনএস-ওয়ান পরীক্ষার কথা বলি। তাতে কারও ডেঙ্গি সংক্রমণ হয়েছে কি না, তার ইঙ্গিত মেলে। তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা শুরু করা যায়।’’ এই ভাবে কলকাতায় বহু রোগীকে বাঁচানো গিয়েছে দাবি করে তাঁর বক্তব্য, ‘‘সরকারি হাসপাতাল এবং পুরসভার ক্লিনিকে এই পদ্ধতি চালু করলে হয়তো আরো অনেককে বাঁচানো যেত।’’ স্বাস্থ্য ভবনের অবশ্য এনএস-ওয়ান পরীক্ষার ফলে ভরসা নেই। অতএব সরকারি হাসপাতাল এবং পুরসভার ক্লিনিকে ডেঙ্গি নিশ্চিত করতে এলাইজা পরীক্ষার ফলের জন্য সাত-আট দিন অপেক্ষা করে বসে থাকতে হচ্ছে। তার মধ্যেই অনেক রোগীর অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
লিজা কোথায় আক্রান্ত হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুর কর্তৃপক্ষ যতই বিষয়টি গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন, দুর্গাপুর শহর কতটা নিরাপদ সে
প্রশ্ন কিন্তু উঠছেই। মেয়রের দাবি, পুজোর পর থেকেই তাঁরা সাফাই অভিযান চালাচ্ছেন। সচেতনতামূলক প্রচার হয়েছে। পুরকর্মীরা লিফলেটও বিলি করেছেন। কিন্তু শহরের বাসিন্দাদের বেশির ভাগই জানাচ্ছেন, এমন কিছু তাঁদের চোখে পড়েনি। বরং জঞ্জাল নিয়মিত সাফাই না হওয়া ও নর্দমায় জল জমে থাকায় বছর-বছর মশার উপদ্রব বাড়ছে। লিজার ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসার পরে সোমবার মেনগেট এলাকায় সাফাই অভিযান হয়, কীটনাশক স্প্রে করা হয়। এ দিন পুরসভায় বৈঠকও হয়েছে।
দুর্গাপুর মহকুমা স্বাস্থ্য দফতর এলাকায় মেডিক্যাল টিম পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছে।