লেক ক্লাবের বিতর্কসভায় (বাঁ দিক থেকে) কৃষ্ণা বসু, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, জহর সরকার ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।— নিজস্ব চিত্র
যোগে দুর্বলতা থাকতে পারে! কিন্তু বাঙালি ভাগে যথেষ্টই দড়ো— এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। ঘণ্টা দুয়েকের জমাটি বিতর্ক-সভায় এই মতটাই খানিকটা মান্যতা পেয়ে গেল।
শনি-সন্ধ্যার লেক ক্লাবে ক্যালকাটা ডিবেটিং সার্কেলের ডাকে কলকাতা-ঢাকা তর্ক-বিতর্ক-র আসর অন্তত ভাগ হওয়া বাঙালির ‘দুর্বলতা’র পক্ষেই রায় দিল।
এ দিন দু’পক্ষের তার্কিকদের বিন্যাস অবশ্য ঠিক কলকাতা বনাম ঢাকা বা এ-পার বনাম ও-পার বাংলার ভাগাভাগিতে হয়নি। যেমন রাজ্য সরকারি আমলা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার, গায়ক-চিত্রপরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, নাটক-সিনেমা পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়দের দলেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক তথা রাজনীতি বিষয়ক টিভি শোয়ের সঞ্চালক শবনম আজিম। যাঁরা সভার মত, ‘বাঙালি দু’ভাগ তাই দুর্বল’-এর পক্ষে সওয়াল করলেন। অন্য দিকে বিরোধী-শিবিরকে মোটামুটি ‘টিম ঢাকা’ বলাই যায়। তবে বর্ষীয়ান সাংবাদিক মহম্মদ জাহাঙ্গির, বাংলাদেশ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তথা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আরিফা রহমান রুমা, বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামি লিগের এমপি ইনামুর রহমান, সাংবাদিক তথা রাজনৈতিক ভাষ্যকার জায়দুল আহসান পিন্টুদের সেই দলে দেখা গেল টালিগঞ্জের নবীন অভিনেত্রী ঋতাভরী চক্রবর্তীকে।
এই সন্ধ্যায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, প্রাক্তন সাংসদ তথা শিক্ষাবিদ কৃষ্ণা বসু বা প্রসার ভারতীর সিইও জহর সরকারের ভূমিকাও অতি বিশিষ্ট। সভার উপদেষ্টা তথা সমালোচকের ভূমিকায় এই বাগ্যুদ্ধকে কাঁটাছেঁড়া করলেন তাঁরা। ভাগ হওয়া বাঙালির ভাগাভাগিতে দক্ষতা নিয়ে শীর্ষেন্দুর রসিকতার আড়ালে খানিক চাপা খেদই বুঝি ফুটে উঠেছিল। বিভাজিত বাংলাকে ঘিরে কিছু খুচরো দুঃখও গোপন থাকেনি। ভারতের সংসদে বৃহৎ বঙ্গপ্রদেশ থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ মিলত বলে মনে করিয়েছেন কৃষ্ণাদেবী। জহর সরকারও স্পষ্ট বললেন, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ ভারত রাষ্ট্রের অঙ্গীভূত থাকলে কোন দিক দিয়ে কতটা আন্তর্জাতিক মান ছুঁতে পারত, তা জল্পনাসাপেক্ষ। তবে পশ্চিমবঙ্গ এত দিনে কোনও প্রধানমন্ত্রী পাওয়া দূরে থাক, ভারত রাষ্ট্রের
চালিকাশক্তি কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের অন্দরে ছড়ি ঘোরানোতেও মোটেই সুবিধে করতে পারেনি।
আফশোসের এই সুরটিতে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশকে ঘিরে বাঙালির শ্লাঘার সুরটি কিন্তু কখনওই ফিকে হয়নি। আরিফা রহমান রুমা যখন বলছেন, আঞ্চলিকতার মাপকাঠিতে বাঙালি সত্তাকে বাঁধা যায় না, কেউ আমেরিকা বা ব্রিটেনের নাগরিক হলেও তো মনে-প্রাণে বাঙালি থাকতেই পারেন, ‘চাঁদে বা মঙ্গলে গেলেও আমি তো বাঙালিই থাকব’, তখন গোটা সভাকক্ষ হাততালিতে ফেটে পড়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের পরে পাক সরকারের অকিঞ্চিৎকর উপনিবেশ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে আজকের বাংলাদেশ হয়ে ওঠার গৌরবটুকু এক সঙ্গেই ভাগ করে নিয়েছেন দু’দিকের বাঙালিই।
তবে দুই বাংলার সামগ্রিক দুর্বলতার বেশ কিছু দিক অনিবার্য ভাবে বার বার উঠে এসেছে। পরিবহণ সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় যদি কলকাতা, ঢাকা, আগরতলা যাত্রার জটিলতা বা বরাক থেকে বর্ধমানের দুস্তর দুরত্বের কথা বলেন, সুমন মুখোপাধ্যায় বাংলা সিনেমার বাজার ভাগ হয়ে যাওয়া নিয়ে হতাশার কথা বলেছেন। সভার মধ্যস্থতাকারী চিকিৎসক কুণাল সরকারও মনে করালেন, ২৫ কোটির বাঙালির পাশে ৭ কোটির তামিল ভাষাভাষীকে সামান্য মনে হলেও তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বাজার টালিগঞ্জের ছ’গুণ। দেখা গেল, বাঙালির সার্বিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা নিয়েও বক্তারা মোটের উপরে একমত।
তবে এত ভঙ্গেও বঙ্গ যে রঙ্গে ভরা সেটাও মালুম হয়েছে বার বার। অনিন্দ্য খোঁচা দিলেন, বাঙালির প্রিয় শব্দ বোধহয় ‘বনাম’! তাই শুধু দু’বাংলায় ভাগাভাগি নয় ক্যালিফোর্নিয়া, মিনেসোটায় দেশান্তরী হয়ে টুকরো টুকরো হওয়াই তার নিয়তি। অভিরূপ সরকারের রসিকতা, বাংলার কবে উন্নতি হবে, প্রশ্ন করলে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরও তা দেখে যেতে পারবেন না বলে কেঁদে ফেলতেন!
ধর্মের গোঁড়ামি বা রাজনীতি যে বাংলা তথা বাঙালিকে বার বার দুর্বল করেছে, তা নিয়েও সভায় দ্বিমত ছিল না। জায়নাল আহসান পিন্টু, মহম্মদ জাহাঙ্গিররা দেশভাগের বাস্তবতা মেনে পারস্পরিক সহযোগিতায় এগনোর পথ খোলা রাখার কথাই বললেন। দু’দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম্পরায় বিশ্বাস রাখার মন্ত্রেও দেখা গেল সকলে বিশ্বাসী। বিতর্কের মূল্যায়ন-পর্বে সৌমিত্রও এই সহযোগিতার ভাবটিতে জোর দিয়েছেন। তবু এক সঙ্গে পথ চলার সাধনে দুই বাংলাকে এখনও অনেক চেষ্টা করতে হবে, এটাও মানতে হল সবাইকেই।
শবনম আজিজ দু’ছত্র গাইলেন, ‘আমি তোমার থেকে দূরে হেঁটে চলে গেছি রোজ’! ভাগ হওয়া জাতির মননের ক্ষতটুকুই শেষ কথা বলে গেল।