ডেঙ্গি নিয়ে বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার নবান্নে। ছবি: সুদীপ আচার্য।
কলকাতা, হাওড়ার সঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনার কলকাতা ঘেঁষা অঞ্চল তো ছিলই। হুগলি, পশ্চিম মেদিনীপুরও বাদ যায়নি। এ বার পশ্চিমবঙ্গের ডেঙ্গি-মানচিত্রে ঢুকে পড়ল দক্ষিণ ২৪ পরগনাও। মৃত্যু হল আর এক জনের। এ ভাবে নিত্যনতুন তল্লাটে ডেঙ্গি ও মশাবাহিত অজানা জ্বর ছড়িয়ে পড়ায় মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ। মঙ্গলবার এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যকর্তাদের কৈফিয়ত তলব করেছেন তিনি।
ঘটনা হল, বর্ষায় সংক্রমণ ছড়াতে পারে আঁচ করে মুখ্যমন্ত্রী ফেব্রুয়ারিতেই সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে মাঠে নামতে বলেছিলেন। তার পরে প্রতি মাসে রিভিউ মিটিংও করেছেন। ‘‘তবু কেন এই অবস্থা?’’— এ দিন নবান্নের বৈঠকে কর্তাদের প্রশ্ন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। উত্তরও নিজেই দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সচেতন করার কাজ ঠিকঠাক না-হওয়াটাই এর মূল কারণ।
এমতাবস্থায় ক্ষুব্ধ মমতার কড়া ফরমান— আগামী তিন মাস রোগ নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি ও ডেঙ্গির চিকিৎসায় কোনও ঢিলেমি চলবে না। ‘‘বিন্দুমাত্র গাফিলতি আমি বরদাস্ত করব না।’’— সাফ জানিয়ে
দিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য-অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথী মনে করেন, মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ স্বাভাবিক। ‘‘ফেব্রুয়ারিতে উনি বৈঠক ডেকে যাঁকে যাঁকে যা যা কাজ করতে বলেছিলেন, তার অনেকগুলোয় খামতি রয়ে গিয়েছে। উনি বকাবকি করতেই পারেন।’’— ব্যাখ্যা দিয়েছেন অধিকর্তা। দফতরের খবর: এ দিন নবান্ন থেকে ফিরে স্বাস্থ্যকর্তারা রাত পর্যন্ত স্বাস্থ্যভবনে বৈঠক করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে তাঁরাও ভেক্টর কন্ট্রোলের অধস্তনদের এক হাত নিয়েছেন বলে দফতর-সূত্রের খবর।
ইতিমধ্যে রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা মঙ্গলবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩৮। ডেঙ্গি আগ্রাসনের মানচিত্রে ঢুকে পড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরও। এ দিন কলকাতার এক হাসপাতালে মারা গিয়েছে মথুরাপুর হাইস্কুলের এগারো ক্লাসের ছাত্রী জ্যোতি বৈরাগী (১৬)। স্বাস্থ্যভবনের খবর: কিশোরীটির রক্তের নমুনায় ডেঙ্গির জীবাণু মিলেছে। কলকাতা পুরসভার দাবি— মেয়েটি বাড়ি থেকেই জ্বর নিয়ে এসে কলকাতার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
এবং জ্যোতিকে ধরলে চলতি মরসুমে এ পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গিতে মৃতের ‘সরকারি’ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬। আগের ৫টি মৃত্যুই হয়েছে গত এক সপ্তাহে। উপরন্তু পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতায় অজানা জ্বরে এক জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। গত ২৫ জুলাই কলকাতায় রয়েড স্ট্রিটের এক নার্সিংহোমে হেমারেজিক ডেঙ্গিতে এক তরুণীর মৃত্যুর খবরও এ দিন সামনে এসেছে। তাঁর ডেথ সার্টিফেকেটে ডেঙ্গির কথা লেখা থাকলেও এখনও সেটি সরকারি খাতায় ওঠেনি।
স্বাস্থ্যভবন জানিয়েছে, কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনার বরাহনগর, সল্টলেক, দক্ষিণ দমদম, হুগলির শ্রীরামপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরের মতো ডেঙ্গি-কবলিত অঞ্চল থেকে রোগ যাতে অন্যত্র ছড়াতে না পারে, সে জন্য জেলা স্বাস্থ্য দফতরগুলিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ দিন নবান্নের বৈঠকে স্বাস্থ্য, পুর, পঞ্চায়েত, ও প্রশাসনের কর্তাদের মুখ্যমন্ত্রী নিজে বলে দিয়েছেন, ‘‘কোথাও জমা জল রেখে দেওয়া যাবে না। সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে দিতে হবে। সব দফতরকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে।’’
পাশাপাশি জনমনে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকের পরে তিনি বলেন, ‘‘বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক মানুষ এখানে আসছেন। তাঁদের সঙ্গে রোগও যাতায়াত করছে। আমাদের তাই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতেই হবে।’’ প্রশাসনকে তাঁর নির্দেশ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ ব্যাপারে প্রচার চালাতে হবে। বড় সরকারি হাসপাতালগুলোয় যাতে চব্বিশ ঘণ্টা রক্ত মেলে, তার বন্দোবস্ত করতে বলে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘‘স্কুল-কলেজের বিষয়ে আমি হস্তক্ষেপ চাই না। স্কুলশিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা দফতরকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’’
সাবধান করছেন ডাক্তারেরাও। চিকিৎসক সংগঠন আইএমএ-র সেক্রেটারি জেনারেল কৃষ্ণকুমার অগ্রবাল এ দিন জানান, জ্বর নেমে যাওয়ার পরের ক’টা দিন খুব গুরুত্বপূর্ণ। বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, জ্বর কমার দু’-এক দিন বাদে আচমকা শরীর খুব বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে কড়া নজরদারি দরকার। প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করতে হতে পারে।