শহরে ছেয়ে গিয়েছে ডেঙ্গি। কিন্তু তেমন ভাবে ঘুম ভাঙেনি পুরসভার! এ চিত্র খোদ হাওড়ার।
যে শহরের মহানাগরিক নিজেই এক জন চিকিৎসক, সেখানে এই ঘুম না-ভাঙা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বাসিন্দারা। তাঁদের কথায়, চিকিৎসাশাস্ত্র যা-ই বলুক না কেন, প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া যুক্তিতেই স্থির রয়েছেন পুর কর্তৃপক্ষ। আর তাই শহর জুড়ে সংক্রমণ জ্বরে আক্রান্ত কিংবা ডেঙ্গি উপসর্গ (এনএস-১ পজিটিভ) নিয়ে কেউ হাসপাতাল ভর্তি হলে বা কারও মৃত্যু হলে তার কারণ ডেঙ্গি বলে মানতে নারাজ হাওড়া পুরসভা ও জেলা স্বাস্থ্য দফতর। কেননা, তাঁদের দাবি এনএস-১ পজিটিভ মানেই ডেঙ্গি নয়।
তবে চিকিৎসক তথা মেয়র রথীন চক্রবর্তী অবশ্য হাওড়া জুড়ে ডেঙ্গির প্রকোপের কথা কার্যত স্বীকার করে বলেন, ‘‘এ বছর ডেঙ্গি বেশি হচ্ছে। তবে এগুলিতে মৃত্যু ঘটছে না। আমরা পুরসভার পক্ষ থেকে ডেঙ্গি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সব রকমের ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছি।’’ মেয়র এ কথা বললেও রাজ্য জুড়ে যখন ডেঙ্গির প্রকোপ বাড়ছে তখন হাওড়া শহরে পুরসভার তরফে কোনও সচেতনতা শিবির যেমন খুব চোখে পড়ছে না, তেমনই ৬৬টি ওয়ার্ডে মশা মারার তেল (লার্ভিসাইড অয়েল) স্প্রে করতে পুরকর্মীদের দেখা যাচ্ছে না বলেই অভিযোগ বাসিন্দাদের। আবার সংক্রমণ জ্বর হলে রক্তপরীক্ষার জন্য ক্যাম্পের আয়োজন করতেও দেখা যায়নি। হাওড়া জেলা হাসপাতাল সূত্রের খবর, ডেঙ্গি নির্ণায়ক রক্তপরীক্ষার (অ্যালাইজা কিট) পরিকাঠামোই ছিল না খোদ জেলা হাসপাতালে। মঙ্গলবার সেই কিট জেলা হাসপাতালে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ভবানী দাস বলেন, ‘‘একেবারে কিট ছিল না তেমনটা নয়। তবে অনেক সময় চাহিদামতো কিট চেয়ে না পাওয়া গেলে এমন সমস্যা হতে পারে। ঠিক কী হয়েছে তা খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’’
গত দু’মাসে বালি থেকে বটানিক্যান গার্ডেন এলাকায় প্রায় ঘরে ঘরে ছেয়ে গিয়েছে সংক্রমণ জ্বর। যাঁদের মধ্যে অনেকেরই আবার এনএস-১ পজিটিভ। হাওড়া পুরসভা সূত্রের খবর, ওই দুই মাসে শহরের ১৬৭৩ জন বাসিন্দা সংক্রমণ জ্বরে আক্রান্ত বলে পুর স্বাস্থ্য বিভাগে নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গি রোগীর সংখ্যা মাত্র ২৮ বলেই দাবি হাওড়া পুরসভার স্বাস্থ্যকর্তাদের। যদিও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের রেকর্ড বলছে গত দু’মাসে ওই সংখ্যা কয়েকশো ছাড়িয়েছে। কয়েক জনের মৃত্যুও হয়েছে। তবে হাওড়া পুরসভার এক স্বাস্থ্য আধিকারিকের কথায়, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা মতো এনএস-১ পজিটিভ হলেই আমরা সেটাকে ডেঙ্গি বলতে পারবো না। তাই হাসপাতালের তথ্য নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে পারবো না।’’
স্থানীয় সূত্রে খবর, বালি, বেলুড়, লিলুয়া, সালকিয়া, দাশনগর, বেলগাছিয়া, চ্যাটার্জিহাট, বেলেপোল, ষষ্ঠীতলা-সহ শিবপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ডেঙ্গি উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর ক্রমশ বাড়ছে। হাওড়া জেলা হাসপাতাল, জায়সবাল হাসপাতাল, বেলুড় স্টেট জেনারেল, উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালেও প্রতি দিন গড়ে ১০ জন করে ডেঙ্গি আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, তা সত্ত্বেও এলাকায় মশা মারার তেল পর্যাপ্ত পরিমাণে স্প্রে করা হচ্ছে না। স্বাস্থ্য শিবিরও তেমন ভাবে হচ্ছে না।
এ বিষয়ে হাওড়া পুরসভার মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘এই অভিযোগ ঠিক নয়। প্রতিটি ওয়ার্ডেই স্বাস্থ্যকর্মীরা যাচ্ছেন। তেল স্প্রে করা হচ্ছে। ক্যাম্প করা হয়নি ঠিকই কিন্তু পুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে সব রকম ব্যবস্থা রয়েছে।’’