পেনকিলারে আরও জটিল হয়ে উঠছে ডেঙ্গি সমস্যা

ঘটনা ১: রক্ত দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্লেটলেট কাউন্ট বাড়ছে না। লিভারে পর্যাপ্ত প্লেটলেট তৈরিই হতে পারছে না! রোগীর অবস্থার অবনতি।ঘটনা ২: রোগীর খাদ্যনালীতে রক্তক্ষরণ (হেমারেজ) চলছে। হেমারেজিক ডেঙ্গি, না কি অন্য কোনও কারণ? চিকিৎসকেরা বুঝে উঠতে পারছেন না।

Advertisement

দেবদূত ঘোষঠাকুর

শেষ আপডেট: ০৩ অগস্ট ২০১৬ ০৫:২৬
Share:

সাফাই অভিযান। দক্ষিণ কলকাতার একটি সরকারি স্কুলে। মঙ্গলবার। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

ঘটনা ১: রক্ত দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্লেটলেট কাউন্ট বাড়ছে না। লিভারে পর্যাপ্ত প্লেটলেট তৈরিই হতে পারছে না! রোগীর অবস্থার অবনতি।

Advertisement

ঘটনা ২: রোগীর খাদ্যনালীতে রক্তক্ষরণ (হেমারেজ) চলছে। হেমারেজিক ডেঙ্গি, না কি অন্য কোনও কারণ? চিকিৎসকেরা বুঝে উঠতে পারছেন না।

ঘটনা ৩: হেমারেজিক ডেঙ্গিতে আক্রান্ত রোগিণীর ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন আচমকা ঊর্ধ্বমুখী। রেনাল ফেলিওরের সম্ভাবনা। চিকিৎসায় তো ত্রুটি ছিল না!

Advertisement

তিনটি ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তির চরম। শেষমেশ অবশ্য ডাক্তারবাবুরা বিভ্রাটের কারণ খুঁজে পেয়েছেন। জানা গিয়েছে, ওই রোগীরা জ্বর, গায়ে যন্ত্রণা শুরুর চার-পাঁচ দিন পরে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন। তবে মাঝের চার-পাঁচ দিন বসে থাকেননি। পাড়ার ফার্মাসিতে জিজ্ঞেস করে প্যারাসিটামল খেয়েছেন। কাজ না হওয়ায় নিয়েছেন ব্যথা কমানোর ক়ড়া ওষুধ। আর তাতেই ‘কেস’ বিগড়ে গিয়েছে। কী রকম?

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, ওই সব ‘পেনকিলার’ লিভারে প্লেটলেট তৈরির হার কমিয়ে দিচ্ছে। কখনও খাদ্যনালীর মিউকাস মেমব্রেন (পর্দা) ফুটো করে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। কিডনির স্বাভাবিক কাজও ব্যাহত করছে। গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট অভিজিৎ চৌধুরী বলছেন, ‘‘ডেঙ্গিতে এমনিতেই প্লেটলেট কমে যায়। পাশাপাশি লিভারে প্লেটলেটের উৎপাদন ব্যাহত করে পেনকিলার। মানে, দু’দিক দিয়েই বিপদ।’’

এমতাবস্থায় বাইরে থেকে প্লেটলেট দিয়েও কাজ হয় না। উপরন্তু প্লেটলেটের উপরে এ হেন ‘সাঁড়াশি’ আক্রমণে দেহের ভিতরে হেমারেজ হতে পারে বলে জানিয়েছেন অভিজিৎবাবু। ব্যথা কমাতে কম মাত্রায় অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়া নিয়ে সতর্ক করেছেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজিস্ট অর্ণব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘কম মাত্রার অ্যাসপিরিন প্লেটলেটের স্বাভাবিক উৎপাদনে বাধা দেয়। ডেঙ্গি আক্রান্তের ক্ষেত্রে অবস্থা আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে।’’ পরজীবী-বিশেষজ্ঞ অমিতাভ নন্দীর অভিজ্ঞতা, ‘‘মহিলার রক্তে ডেঙ্গির প্যারাসাইট এত বেশি ছিল না, যাতে কিডনি প্রভাবিত হয়। তবু ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন ভীষণ বেড়ে গেল। শুনলাম, উনি জ্বরের পরে পাঁচ দিন পেনকিলার কিনে খেয়েছেন। রহস্যটা তখন খোলসা হল।’’

শেষ পর্যন্ত মহিলার শরীরে জমে থাকা পেনকিলার স্যালাইন দিয়ে বার করতে হয়েছে। ‘‘নচেৎ রেনাল ফেলিওরেই মৃত্যু হতে পারত’’— মন্তব্য অমিতাভবাবুর। তাঁর বক্তব্য: ব্যথার ওষুধ বেশি দিন খেলে খাদ্যনালীর পর্দার ক্ষতি হয়। পর্দা ফুটো হয়ে রক্তক্ষরণও হতে পারে, যা হেমারেজিক ডেঙ্গির রক্তক্ষরণের চেয়ে আলাদা। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘মিউকাস মেমব্রেনে পেনকিলারের রাসায়নিক জমলে বাড়তি স্যালাইনে দূর করা যেতে পারে। কিন্তু এক বার পর্দা ফুটো হয়ে গেলে বিশেষ কিছু করার থাকে না।’’

ব্যথানাশকই শুধু নয়। পাড়ার দোকান অনেককে চটপট জ্বর সারাতে অ্যান্টিবায়োটিক-ও ‘প্রেসক্রাইব’ করছে! ফলে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে বলে চিকিৎসকদের অভিযোগ। স্বাস্থ্যভবনের কী ভূমিকা?

এক স্বাস্থ্যকর্তার দাবি, ‘‘প্রেসক্রিপশন ছাড়া যথেচ্ছ পেনকিলার খাওয়ার কুফল সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। ড্রাগ কন্ট্রোলের তরফেও অভিযান চলেছে।’’তাতে কোনও ফল হয়েছে?

রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের এক কর্তার গলায় অসহায়তা— ‘‘আমাদের ইন্সপেক্টর বাড়ন্ত। সব সময়ে নজরদারি চালানো যায় না। অনেক ফার্মাসি তার সুযোগ নিচ্ছে।’’ ওঁর আক্ষেপ, ‘‘দোকানদারেরা জানেন, মুড়ি-মুড়কির মতো অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ায় জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবু তাঁরা সেই কাজটাই করছেন।’’ দোকানদারেরা কী বলেন?

রাজ্যে ওষুধ বিক্রেতাদের সংগঠন‘বেঙ্গল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এর সম্পাদক সুবোধ ঘোষের বক্তব্য, ‘‘পেনকিলার বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি হওয়ার কথা নয়। শহরে নিয়মটা কম-বেশি মানা হয়। তবে অনেক গ্রামে-গঞ্জে হাতুড়েদের লিখে দেওয়া কাগজ অনুযায়ী ওষুধ না-বেচে উপায় নেই। জনরোষের মুখে পড়তে হতে পারে।’’ অন্য দিকে চিকিৎসকদের সংগঠন আইএমএ মনে করছে, এ নিয়ে স্বাস্থ্য দফতর ও ড্রাগ কন্ট্রোলের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল কৃষ্ণকুমার অগ্রবাল বলেন, ‘‘মানুষকে সচেতন করতে হবে।
দোকানদারদের কিছু না-বললে তো এমনই চলতে থাকবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement