প্রশ্ন কল্যাণী-কাণ্ডে

জেল খেটে আসা ডাক্তার বিভাগীয় প্রধান কী ভাবে

আগাগোড়াই অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবু তাঁকে কিছু বলার থেকে নিজেদের মুখে তালা লাগানোটাই যে শ্রেয়, তা বুঝে গিয়েছিলেন হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তারা। কারণ, তাঁর হাত নাকি অনেক ‘লম্বা’।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০১৭ ০০:০০
Share:

আগাগোড়াই অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবু তাঁকে কিছু বলার থেকে নিজেদের মুখে তালা লাগানোটাই যে শ্রেয়, তা বুঝে গিয়েছিলেন হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তারা। কারণ, তাঁর হাত নাকি অনেক ‘লম্বা’।

Advertisement

চিট ফান্ড-চক্র, ঘুষ নিয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানো, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় পলিক্লিনিক খোলার ছাড়পত্র পাইয়ে দেওয়ার জন্য মোটা টাকা নেওয়া— এ সব অভিযোগের কথা জানতেন তাঁর সহকর্মী থেকে ঊর্ধ্বতন সবাই। কিন্তু সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান বলে কথা। তাই তাঁকে ঘাঁটাতে চাননি কেউ। বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশ তাঁকে গ্রেফতারের পরে এখন অবশ্য জেরায় বেশ কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে সরকারি হাসপাতালের ওই তরুণ রেডিওলজিস্টের মুখ থেকে।

ন’টি মামলায় অভিযুক্ত, জালিয়াতি, জোচ্চুরির ঘটনায় ধরা পড়ে একাধিক বার জেল খেটে আসা চিকিৎসক শান্তনু তথাগত পাল কল্যাণী জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজের রেডিওলজি বিভাগের প্রধান কী করে হলেন, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে। এমনকী, দক্ষিণ ভারতের একটি অখ্যাত বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের শংসাপত্র নিয়ে এ রাজ্যের সরকারি মেডিক্যাল কলেজের বিভাগীয় প্রধান হওয়ার পিছনে কোন জাদু কাজ করেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের তদন্তকারীরা। আদি চুনচুনাগিরি মেডিক্যাল কলেজের যে শংসাপত্র দাখিল করে কল্যাণীর সরকারি মেডিক্যাল কলেজে তাঁর চাকরি হয়েছে, সেই শংসাপত্রের বৈধতা, এমনকী ওই মেডিক্যাল কলেজের রেজিস্ট্রেশন নিয়েও প্রশ্ন ওঠায় কল্যাণী মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ এখন উঠেপড়ে লেগেছেন সে সব খতিয়ে দেখতে। তবে ওই চিকিৎসকের মাথার উপরে যে রাজ্য স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’-এক জন কর্তার হাত ছিল, তা তাঁর দেড় বছরের কার্যকলাপেই স্পষ্ট। ওই হাসপাতালের আর এক তরুণ শল্য চিকিৎসকও তাঁর নানাবিধ অবৈধ কাজকর্মের সঙ্গী ছিলেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। সম্প্রতি বিধাননগরে তাঁর এক কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাটটি সতীর্থ ওই চিকিৎসককে বিক্রি করেছিলেন তিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আপাতত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

Advertisement

হাসপাতাল রেজিস্টার বলছে, গত তিন মাসে এক দিনও হাসপাতালমুখো হননি ওই চিকিৎসক। কিন্তু কল্যাণীতে প্রায় রোজই দেখা যেত তাঁকে। হলদিয়া ও কল্যাণীর বিভিন্ন পলিক্লিনিকের চেম্বারে হাজিরা ছিল নিয়মিত। দামি গাড়ি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক ওই চিকিৎসকের কল্যাণীর ঠিকানা ছিল একটি গেস্ট হাউসের স্যুইট। এ দিকে, দিনের পর দিন বর্ধমান, হুগলি, ঝাড়গ্রাম, আসানসোল থেকে লোকজন এসে শান্তনু তথাগতবাবুর খোঁজ করত। তাঁর চিটফান্ডে টাকা রাখার কিছু দিন পর থেকেই তিনি আমানতকারীদের এড়িয়ে চলতেন ও নতুন জায়গায় টাকা তোলার ফাঁদ পাততেন বলে অভিযোগ। সেই অভিযোগ লিখিত ভাবে মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষকে জমাও দেন কয়েক জন আমানতকারী। কিন্তু তা স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় অবধি পৌঁছে ফাইলবন্দি হয়ে যায়।

দেড় বছর আগে এই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে যোগ দেন শান্তনু তথাগতবাবু। কলেজের কয়েক জন শিক্ষক-চিকিৎসকের কথায়, ‘‘খুঁটির জোর থাকায় রেডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হতে বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু নিজের বিভাগেই দেখা মিলত না তাঁর অধিকাংশ দিন।’’ কল্যাণীর এই সরকারি মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের হাজিরার হিসেব রাখার জন্য বায়োমেট্রিক কার্ড চালু হয়েছিল বছর দেড়েক আগে। এর ঘোরতর বিরোধী ছিলেন শান্তনু তথাগত-সহ বেশ কয়েক জন চিকিৎসক। হাজিরার খাতাটিও প্রিন্সিপালের দফতর কিংবা মেডিক্যাল সুপারের ঘরে থাকার কথা থাকলেও নিজের বিভাগের হাজিরার খাতা আগাগোড়াই তিনি নিজের ঘরে রাখতেন বলে অভিযোগ। কখনও হাসপাতালে এলে প্রতিদিনের হাজিরা এক দিনেই দিয়ে দিতেন। হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপার সুবিকাশ বিশ্বাস বলেন, ‘‘বিষয়টি হাসপাতালের প্রশাসনিক বৈঠকে মহকুমাশাসকেরও নজরে আসে। তিনি কড়া পদক্ষেপের কথা বলায় আমরা রেকর্ড খতিয়ে দেখছি। শেষ তিন মাসে আর হাসপাতালের রেজিস্টারে সই করননি ওই চিকিৎসক। আরও কে কে জড়িত, সবটাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এ রকম জালিয়াতির অভিযোগ ওঠাটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আরও দুর্ভাগ্যজনক তাঁর সঙ্গীদের মদত দিয়ে যাওয়াটা।’’ স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সুকান্ত সিংহ বলেন, ‘‘এগ্‌জিকিউটিভ কাউন্সিলের বৈঠকে আলোচনা করে ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বারবার অভিযোগ ওঠায় তাঁকে সাসপেন্ডও করা হতে পারে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement