ডাক্তার-ঘাটতি মেনে বামকে দুষলেন মন্ত্রী

ঘোষণা হয়েছে: রাজ্যে আরও ন’টি মেডিক্যাল কলেজ খোলা হবে। ঘোষণা হয়েছে: তৈরি হচ্ছে ৩৪টি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল। কিন্তু সেই সব মেডিক্যাল কলেজে পড়াবেন কারা? নতুন নতুন হাসপাতালে চিকিৎসাই বা করবেন কোন বিশেষজ্ঞেরা? এত দিন বিভিন্ন মহল থেকে এই সব প্রশ্ন উঠছিল বিচ্ছিন্ন ভাবে। এ বার খাস বিধানসভায় এই বিষয়ে সরব হলেন বিরোধীরা।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০১৫ ০৩:৩২
Share:

ঘোষণা হয়েছে: রাজ্যে আরও ন’টি মেডিক্যাল কলেজ খোলা হবে। ঘোষণা হয়েছে: তৈরি হচ্ছে ৩৪টি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল। কিন্তু সেই সব মেডিক্যাল কলেজে পড়াবেন কারা? নতুন নতুন হাসপাতালে চিকিৎসাই বা করবেন কোন বিশেষজ্ঞেরা?

Advertisement

এত দিন বিভিন্ন মহল থেকে এই সব প্রশ্ন উঠছিল বিচ্ছিন্ন ভাবে। এ বার খাস বিধানসভায় এই বিষয়ে সরব হলেন বিরোধীরা। মঙ্গলবার কংগ্রেস এবং বিজেপির একাধিক বিধায়ক বিধানসভায় প্রশ্ন তোলেন, শিক্ষক-চিকিৎসকের অভাবে রাজ্যে মেডিক্যাল শিক্ষার মান যে-ভাবে নামছে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে পরিষেবার মানও কি সেই ভাবে নামতেই থাকবে?

এ দিন বিধানসভায় স্বাস্থ্যে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা ছিল। সেই অধিবেশনে মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী না-থাকলেও হাজির ছিলেন স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। রাজ্যে ডাক্তার-ঘাটতির কথা স্বীকার করে নেন তিনি। তবে তার জন্য পূর্বতন বাম সরকারকেই দায়ী করে সমালোচনার জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন চন্দ্রিমাদেবী। তিনি বলেন, ‘‘টানা ১৫-২০ বছর যারা নিয়োগের কথা ভাবেনি, ডাক্তারের সংখ্যা বাড়ানোর কথা ভাবেনি, বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এখন তাদের এই নিয়ে অভিযোগ করার কোনও নৈতিক অধিকার নেই। এই সমস্যা মেটানো সময়সাপেক্ষ। আমাদের হাতে কোনও জাদুদণ্ড নেই যে, রাতারাতি সব অভাব মিটিয়ে ফেলব!’’

Advertisement

মুশকিল আসানে তাঁরা কী কী করছেন, তার খতিয়ানও দেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, বিশেষজ্ঞ-চিকিৎসকের ঘাটতি মেটাতে তাঁরা জেলা স্তরেও ডিএনবি কোর্স চালু করেছেন। মোট আটটি জেলায় তা চালু হয়েছে। ২০১০-’১১ আর্থিক বছরে রাজ্যে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৩২৮৬ কোটি টাকা। এখন সেটা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

নতুন নতুন সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল এবং মেডিক্যাল কলেজের প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেস বিধায়ক মানস ভুঁইয়া জানতে চান, ওই সব হাসপাতালের জন্য চিকিৎসক মিলবে কোথা থেকে? খাস কলকাতারই বহু মেডিক্যাল কলেজে স্নায়ুরোগের অস্ত্রোপচারের ডাক্তার না-থাকায় রোগীদের বাঙুর ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজিতে রেফার করে দেওয়া হয়। তা হলে শালবনি, ডেবরার সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে ডাক্তার মিলবে কোথা থেকে? সেটাও ভাবা দরকার। ‘‘রাজ্যে ডাক্তারের অভাব মেটাতে আরও অন্তত ২০ বছর লেগে যাবে,’’ মন্তব্য করেন ওই কংগ্রেস বিধায়ক।

একই সুর ছিল রাজ্যে বিজেপির একমাত্র বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্যের কথায়। তিনি বলেন, ‘‘ডাক্তার-রোগী অনুপাত, এমনকী জুনিয়র ডাক্তার-রোগী অনুপাতটাও তো তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই অবস্থায় সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটা ভেবেই স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি।’’ সিপিএমের বাদল জমাদারও স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ঘাটতি নিয়ে অভিযোগ করেন। এসইউসি-র তরুণকান্তি নস্কর বলেন, ‘‘এতগুলো নতুন মেডিক্যাল কলেজ খোলা হবে। প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও পরিকাঠামো না-থাকলে সেই সব কলেজ থেকে ছাত্রছাত্রীরা কী শিখে বেরোবে?’’

বিরোধীরা ডাক্তারের অভাবের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যে রাজনীতি নিয়েও কটাক্ষ করেন। কংগ্রেসের মানসবাবু অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে রাজনৈতিক রং দেখে নিয়োগ করা হচ্ছে। এর ফলে চিকিৎসার মান আরও পড়ে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বাম আমলের সমালোচনা করতেও ছাড়েননি তিনি। বলেন, ‘‘সূর্যকান্ত মিশ্রের আমলেও রং দেখে নিয়োগ হত। এখনও তা-ই হচ্ছে। ফলে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেডিক্যাল শিক্ষা।’’ হাসপাতালগুলিতে দালাল চক্রের রমরমা, খাস কলকাতার মেডিক্যাল কলেজগুলিতে প্রসূতি-মৃত্যু নিয়েও স্বাস্থ্যকর্তা এবং চিকিৎসকদের একাংশের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন তিনি। বলেন, ‘‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে অনেকেই যা খুশি, তা-ই করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। এ-সবের জন্যই ভেলোর, দিল্লি, বেঙ্গালুরুগামী ট্রেনে রোগীর ভিড় কমানো যায়নি।’’

রাজ্যে স্বাস্থ্যের হাল কী, তা বোঝাতে গিয়ে এ দিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি খবরের উল্লেখ করেন মানসবাবু। ওই প্রতিবেদন জানাচ্ছে, রক্তের অভাবে সোমবার কৃষ্ণনগর জেলা হাসপাতালে এক তরুণী প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। সেখানকার ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্ত ছিল। কিন্তু পরীক্ষার কিট না-থাকায় তাঁকে সেই রক্ত দেওয়া যায়নি। রক্ত না-পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু হয়েছে ওই তরুণীর। ‘‘এ রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ,’’ বলেন মানসবাবু।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement