আত্মপ্রকাশ ও ভানুপ্রকাশ সিংহ। — নিজস্ব চিত্র।
ওঁদের দাবি, প্রোমোটারি-ব্যবসায় ‘ঘুষের খেলা’ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল না। তাই প্রথম কারবারে নেমে প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এবং উৎকোচের চাহিদা তাঁদের সাধ্য ও সহ্যের সীমা পেরিয়ে যাওয়াতেই শেষমেশ সব ফাঁস করে দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন লিলুয়ার দু’ভাই— আত্মপ্রকাশ ও ভানুপ্রকাশ সিংহ।
সিংহ ভাইদের অভিযোগকে কেন্দ্র করেই সামনে এসেছে ঘুসুড়ির ঘুষ-কাণ্ড, যা কিনা শোরগোল ফেলে দিয়েছে গোটা রাজ্যে। দুর্নীতিদমন শাখার হাতে ধরা পড়েছেন সদ্য অবলুপ্ত বালি পুরসভার ইঞ্জিনিয়ার প্রণব অধিকারী, যাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে ‘কুবেরের’ সম্পদ। সিংহ ভাইদের মূল অভিযোগের আঙুলও তাঁর দিকে। কী রকম?
আত্মপ্রকাশ-ভানুপ্রকাশের বক্তব্য: লিলুয়ায় একটা সাড়ে ১৩ কাঠা জমিতে বহুতল তৈরি করতে গিয়ে ওঁরা প্রণবের খপ্পরে পড়েন। তাঁদের অভিযোগ, নির্মাণের ছাড়পত্র মঞ্জুরির বিনিময়ে কাঠাপিছু দেড় লক্ষ হিসেবে অন্তত কুড়ি লক্ষ টাকা ‘প্রণামী’ চেয়েছিলেন ওই ইঞ্জিনিয়ার। দু’ভাইয়ের দাবি, অর্ধেকের বেশি মিটিয়ে দেওয়া হলেও কাজ হয়নি। উল্টে চাহিদা আরও বেড়ে গিয়েছিল। তখনই ওঁরা রাজ্য দুর্নীতিদমন শাখার দ্বারস্থ হন।
শাখা-সূত্রের খবর: ঘুষ-কাণ্ড উদ্ঘাটনে দু’ভাইয়ের অভিযোগই ছিল মূল সূত্র। তাঁরা মোবাইলের ফুটেজ-সহ বেশ কিছু প্রমাণও পেশ করেছিলেন। তার ভিত্তিতে অভিযান চলে। তদন্তকারীদের পর্যবেক্ষণ, যতটুকু সামনে এসেছে, তা আসলে হিমশৈলের চূড়ামাত্র। কিন্তু সিংহ ভাইয়েরা এত টাকা ঘুষ দেওয়ার পরে কেন অভিযোগ জানালেন?
আত্মপ্রকাশ রবিবার বলেন, ‘‘আমরা আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। পরিস্থিতির চাপে হয়ে ওঠেনি।’’
নিজের বাড়িতে বালি পুরসভার ইঞ্জিনিয়ার বাসুদেব দাস। ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার।
এ দিন সকালে লিলুয়ার শান্তিনগরে নিজেদের ফ্ল্যাটে বসে পুর-দুর্নীতি সম্পর্কে বহু কথাই শোনা গিয়েছে ওঁদের মুখে। মধ্যবিত্ত পরিবার। বাবা প্রমথনাথ হিন্দুস্থান মোটরসের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। প্রোমোটিংয়ে নেমে সচ্ছলতা মুখ দেখতে চেয়েছিলেন দু’ভাই। ২০১৩-র শেষাশেষি লিলুয়ার ২০ই নম্বর দেবীমন্দির লেনে সাড়ে ১৩ কাঠা জমি নেন। মালিকের সঙ্গে ‘যৌথ উদ্যোগের’ সুবাদে জমির কোনও দাম দিতে হয়নি। চুক্তি ছিল, ওঁরা ওখানে নিজেদের খরচে বহুতল বানিয়ে দেবেন। ‘‘বাবার জমানো টাকা আর পরিবারের গয়নাগাটির ভরসায় বুক ঠুকে নেমে পড়েছিলাম। ধারণাতেই ছিল না, তলে তলে এমন ঘুষের খেলা চলে!’’ — বলছেন ওঁরা।
দু’ভাই জানিয়েছেন, জমিটিতে বহুতল তোলার ছাড়পত্র চেয়ে তাঁরা তদনীন্তন বালি পুরসভায় আবেদন করেছিলেন ২০১৪-র জানুয়ারিতে। লিলুয়া এলাকার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত পুর-ইঞ্জিনিয়ার তথা ওয়ার্ড ইন্সপেক্টর প্রণব অধিকারী ‘অনুমতি বাবদ’ কাঠাপিছু দেড় লক্ষ টাকা ঘুষ চেয়ে বসেন বলে ওঁদের অভিযোগ। অর্থাৎ, মোট সওয়া ২০ লক্ষ টাকা। আত্মপ্রকাশের কথায়, ‘‘প্রথম প্রোমোটিং করছি। কোথায় পাব অত টাকা! তাই ওঁকে অনুরোধ করেছিলাম, দরটা একটু কমান।’’
প্রণব দরাদরিতে রাজি হননি। তবে কয়েক কিস্তিতে প্রণামী মেটানোর সুযোগ দেন। ‘‘আমাদের তখন শিরে সংক্রান্তি। পিছিয়ে আসার উপায় নেই।’’— বলছেন আত্মপ্রকাশ।
অগত্যা ওঁরা প্রণবের দাবি মেটানোর তোড়জোড় শুরু করেন। আত্মপ্রকাশ জানান, বাড়ির মহিলাদের গয়না দফায় দফায় একটি বেসরকারি আর্থিক সংস্থায় বন্ধক রেখে সাড়ে ১১ লক্ষ টাকা জোগাড় হয়। তা হাতে পেয়ে প্রণব নক্শা মঞ্জুর করেন। যদিও সেই নক্শা সিংহ ভাইয়েরা হাতে পাননি। ভানুপ্রকাশের অভিযোগ, ‘‘প্রণববাবু পরিচিত এক জনের নামে লেটার অব অথরাইজেশন লিখিয়ে পুরসভা থেকে প্ল্যান তুলিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন। তার পরে বাকি ন’লাখ টাকার জন্য আমাদের চাপ দিতে থাকেন।’’
পুর-কর্তৃপক্ষকে জানাননি?
ভানুপ্রকাশের জবাব, ‘‘বালি পুরসভার তখনকার চেয়ারম্যান অরুণাভ লাহিড়ীর কাছে গিয়েছিলাম। উনি সাহায্য তো করলেনই না, উল্টে বললেন, প্রণববাবুর চাহিদা মতো টাকা দিয়ে দিতে!’’ অরুণাভবাবু অবশ্য অভিযোগ ফুৎকারে ওড়াচ্ছেন।
‘‘ওই প্রোমোটারদের চিনি-ই না। সব ভিত্তিহীন। পরিকল্পনামাফিক বানিয়ে বানিয়ে বলা হচ্ছে।’’— এ দিন মন্তব্য অরুণাভবাবুর।
অন্য দিকে আত্মপ্রকাশদের দাবি, উপায় না-দেখে তাঁরা বেশ কিছু দিন হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন। মাস ছয়েক আগে তাঁরা প্রণবের কাছে গিয়ে প্ল্যানের কপি চাইতেই তিনি এক লাখ টাকা হেঁকে বসেন। এবং জানান, এটা অতিরিক্ত, এর পরেও ন’লাখ লাগবে। আত্মপ্রকাশের কথায়, ‘বুঝতে পারলাম, উনি আমাদের ফাঁদে ফেলতে চাইছেন।’’
দেরি না-করে ওঁরা হাওড়ার এক পুলিশকর্তার দ্বারস্থ হন। তাঁরই পরামর্শ মতো নালিশ করেন রাজ্য দুর্নীতিদমন শাখায়। আত্মপ্রকাশ বলেন, ‘‘এমনও দিন গিয়েছে, বাচ্চাদের স্কুলের ইউনিফর্ম কিনতে পারিনি, অথচ প্রণব অধিকারীর টাকা মেটাতে হন্যে হয়ে ঘুরেছি। তখনই ঠিক করেছিলাম, ওঁকে শাস্তি দেওয়াতেই হবে।’’ ওঁদের আশা, প্রণবের কুকীর্তি এ বার ফাঁস হওয়ায় নক্শা পেতে অসুবিধে হবে না।
শুধু ওঁরা নন। বালি-লিলুয়া তল্লাটের বহু নির্মাণ-ব্যবসায়ী এ ভাবে প্রণব অধিকারীর পকেট ফাঁপিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তবে এখনই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর ব্যাপারে তাঁরা দ্বিধায়। নাম প্রকাশ না-হওয়ার শর্তে কেউ কেউ প্রণবের সঙ্গে ‘লেনদেনের’ অভিজ্ঞতাও শুনিয়েছেন। যেমন?
তাঁরা বলছেন, এ সব ক্ষেত্রে নিজের বাড়ি ছাড়া প্রণব অন্য কোথাও যেতে চাইতেন না। দেখা করতে হলে আগাম ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ নিতে হতো। পাঁচ মিনিট দেরি হলে কিংবা কলিং বেল এক বারের বেশি দু’বার বাজালেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট ‘ক্যান্সেল!’ বাড়ির কেউ দরজায় এসে বলে যেত, পরবর্তী সাক্ষাতের সময় ফোনে জানানো হবে।
দুর্নীতিদমনের অফিসারেরা জানিয়েছেন, সব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রণবকে জালে ফেলার ছক কষা হয়েছিল। ঠিক হয়, শুক্রবার দুপুরে আত্মপ্রকাশ-ভানুপ্রকাশ প্রণবের বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসবেন এক লাখ টাকার একটা বান্ডিল, যাতে স্প্রে করা থাকবে চিহ্নিতকরণের বিশেষ রাসায়নিক। পরিকল্পনা মতো সিংহ ভাইয়েরা টাকা দিয়ে আসার পরেই প্রণবের ডেরায় হানা দেন গোয়েন্দারা। প্রথম চেষ্টায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও নোটের বান্ডিলটি মেলেনি। পরে তার হদিস মেলে। বাথরুমে অব্যবহৃত কমোডের মধ্যে।