একদিকে ড্রেজিং, অন্যদিকে মাটি ফেলে নদী বুজিয়ে সেতুর কাজ

ইছামতী নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকায় শঙ্কিত বাসিন্দারা

একদিকে নদীর স্রোত ফেরাতে ড্রেজিং করে পলি তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীর দু’পাশে মাটি ফেলে তার আয়তন ছোট করে তৈরি করা হচ্ছে কাঠের সেতু।

Advertisement

নির্মল বসু ও সীমান্ত মৈত্র

শেষ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০১৪ ০১:১৬
Share:

বেড়িগোপালপুরে একদিকে চলছে ড্রেজিং।

একদিকে নদীর স্রোত ফেরাতে ড্রেজিং করে পলি তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীর দু’পাশে মাটি ফেলে তার আয়তন ছোট করে তৈরি করা হচ্ছে কাঠের সেতু। এতে ইছামতী সংস্কারে লাভের লাভ যে কিছু হবে না, প্রতি বছরের মতো বর্ষায় দু’কূল ছাপিয়ে নদী ফের যে তাঁদের ভাসাবে সে কথা ভেবে প্রতিবাদে সোচ্চার হলেন উত্তর ২৪ পরগনা স্বরূপনগরের মানুষ।

Advertisement

রবিবার বিক্ষোভের জেরে স্বরূপনগরের তরণীপুরে নদীর উপরে সেতুর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তা অবরোধ করে এক দল জনতা সেতু তৈরির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখালে আর এক দল জনতা তার প্রতিবাদ করে। বড় ধরনের গোলমালের আশঙ্কায় এলাকায় পৌঁছয় পুলিশ। হাজির হন বিডিও। তাঁদের হস্তক্ষেপে ফের সেতুর কাজ শুরু হয়।

নদীর দু’পাশে মাটি ফেলে ভরাট করে সেতু করতে গিয়ে নদীর স্রোত ব্যাহত হওয়ার প্রসঙ্গে জেলা পরিষদের সভাধিপতি রহিমা মণ্ডল বলেন, “দু’পারের মানুষের কথা ভেবে ২৫ লক্ষ টাকায় কাঠের সেতু করা হচ্ছে। তবে নদীর দু’পাশে মাটি ফেলে নদী ছোট করার যে অভিযোগ এবং সেতুর স্থান পরিবর্তনের যে দাবি উঠেছে তা খতিয়ে দেখে এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Advertisement

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে খবর, বনগাঁর গাইঘাটার বেড়িগোপালপুর এবং বসিরহাটের মহকুমার স্বরূপনগরের তরণীপুরের মধ্যে ইছামতীতে কংক্রিটের সেতুর দাবি দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে বহু বিক্ষোভ-আন্দোলনের পর ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজ্যের তদানীন্তন পূর্তমন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামী তরণীপুর বাজারে কংক্রিটের সেতুর শিলান্যাস করেন। কিন্তু নির্বাচনের পরে রাজ্যে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে সেতুর ভবিষ্যত্‌ চলে যায় বিশ বাঁও জলে। এ নিয়ে বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ কিছুই বাকি থাকেনি। এমনকী সেতু নিয়ে স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। নিজেরাই কমিটি গড়ে, চাঁদা তুলে বাঁশ-খুঁটি দিয়ে নদীর উপরে ২৪০ ফুট দীর্ঘ সেতু বেঁধে ফেলেন এলাকার মানুষ।

অন্যদিকে নদীতে মাটি ফেলে শুরু হয়েছে সেতুর কাজ।

বাসিন্দাদের দাবি, তাঁদের বিক্ষোভ-আন্দোলনের ফলে কংক্রিটের সেতুর জন্য বর্তমান সরকার সেতুর জন্য ১২ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা মঞ্জুর করেছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সমস্যার জন্য তা খারিজ হয়ে যায়। এর পরেই জেলা পরিষদের তরফে বিদ্যাধরী ড্রেনেজ ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে কাঠের সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ওই সেতুর কাজ শুরু হতেই গোলমাল বাধে। আন্দোলনকারীদের দাবি, যেখানে কংক্রিটের সেতু তৈরির কথা ছিল সেই জায়গা বাদ রেখে কাঠের সেতু করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কংক্রিটের সেতু তৈরির ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা না হয়। নদীর দু’পাশে মাটি ফেলে নদী ছোট করে ফেলে কাঠের সেতু করলে সরু হয়ে যাওয়ার কারণে স্রোত বাধা পাবে। বর্ষায় নদী উপচে এলাকা ভাসবে। এই আশঙ্কায় বাসিন্দারা বিক্ষোভ-আন্দোলনে নামেন। কিন্তু এলাকার মানুষের একাংশ ওই জায়গাতেই সেতুর দাবি তুলে এই বিক্ষোভ-আন্দোলনের প্রতিবাদ করে।

প্রসঙ্গত, ইছামতীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় এবং স্রোতহীন হয়ে পড়ায় প্রতি বছর বর্ষায় বনগাঁ, গাইঘাটা, স্বরূপনগরের একটা বড় অংশ ৪-৫ মাস ধরে জলমগ্ন থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় বাসিন্দাদের। ফসলেরও প্রভূত ক্ষতি হয়। সেই কারণে গাইগাটার কালাঞ্চি থেকে স্বরূপনগরে টিপি পর্যন্ত ইছামতীর নাব্যতা বাড়াতে ড্রেজিং শুরু হয়েছে। এর পরে কী ভাবে তরণীপুর ও বেড়িগোপালপুরের মধ্যে নদীতে মাটি ফেলে সেতু তৈরি হচ্ছে তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি প্রশাসনিক মহলেও অনেকে বিস্মিত।

ইছামতী সংস্কার সহায়তা কমিটির সম্পাদক সুভাষ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “কাঠের সেতুর মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী। যে ভাবে পরিকল্পিত ভাবে নদীকে ছোট করে সেতু তৈরি হচ্ছে তাতে সামনের বর্ষায় বনগাঁ, বেড়িগোপালপুর এবং স্বরূপনগরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হবে।” সেই সঙ্গে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেননি তিনি। ইছামতী নদী আন্দোলন কমিটির সম্পাদক মেপ্তাউদ্দিন পার বলেন, “কংক্রিটের সেতুর আন্দোলন নষ্ট করতে জনৈক আবেদ আলি মণ্ডলের নেতৃত্বে কিছু লোক এ দিন আমাদের লোকজনদের উপরে চড়াও হয়। মাইক ভাঙচুর করে। আমাদের হটিয়ে কাঠের সেতুর কাজ শুরু করে দেয়। যে ভাবে নদীর দু’পাশ বুজিয়ে সেতু করা হচ্ছে তাতে দু’পারের মানুষ বন্যাকবলিত হয়ে পড়বেন। তা ছাড়া বর্ষায় ৩-৪ মাস বেড়িগোপলপুর বাজার জলে ডুবে যায় সেখানকার মানুষ সেতু ব্যবহার করবেন কী ভাবে? তাই তরণীপুর ও শ্রীনাথপুরের মধ্যে সেতু করতে বলা হয়েছিল।”

অন্য দিকে আবেদ আলির বক্তব্য, “মেপ্তাউদ্দিনরা সেতু অন্যত্র সরানোর যে পরিকল্পনা করেছিলেন তাতে আখেরে দু’পারের বাজারের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। তা ছাড়া নদীতে যে ভাবে ড্রেজিং করে গভীরতা বাড়ানো হচ্ছে তাতে বর্ষায় আর নদীর পার ভাসবে না।”

এখন কাঠের সেতু দু’পারের মানুষের সমস্যা মেটাবে নাকি তাঁদের ভাসাবে, বর্ষাতেই তার উত্তর মিলবে।

ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement