বিডিও-র দু’টি অভিযোগে ফারাক কেন, তদন্তের নির্দেশ

অশোকনগরে তৃণমূল বিধায়ক ধীমান রায়ের সামনেই তাঁকে হেনস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ এনেছিলেন হাবরা ২-এর বিডিও দীনবন্ধু গায়েন। কিন্তু তাঁর অভিযোগপত্র নিয়ে কিছু সংশয় দেখা দেওয়ায় তা নিয়ে একটি পৃথক তদন্ত করা হবে বলে ঠিক হয়েছে। সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক, জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মহকুমা পুলিশ অফিসারকে নিয়ে একটি তদন্তকারী দল তৈরি করা হয়েছে। তদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরেই নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে পদক্ষেপ করবে।

Advertisement

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০১৪ ০৩:৩০
Share:

অশোকনগরে তৃণমূল বিধায়ক ধীমান রায়ের সামনেই তাঁকে হেনস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ এনেছিলেন হাবরা ২-এর বিডিও দীনবন্ধু গায়েন। কিন্তু তাঁর অভিযোগপত্র নিয়ে কিছু সংশয় দেখা দেওয়ায় তা নিয়ে একটি পৃথক তদন্ত করা হবে বলে ঠিক হয়েছে।

Advertisement

সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক, জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মহকুমা পুলিশ অফিসারকে নিয়ে একটি তদন্তকারী দল তৈরি করা হয়েছে। তদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরেই নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে পদক্ষেপ করবে।

অভিযোগপত্র নিয়ে কী ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে? জানা গিয়েছে, একই মেমো নম্বরে বিডিও-র দু’টি অভিযোগ সামনে এসেছে। দু’টি অভিযোগের বয়ানে কিছুটা ফারাক রয়েছে। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দীনবন্ধুবাবু দাবি করেন, প্রথমে তিনি ই-মেল মারফত অশোকনগর থানাকে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় তিনি ফের থানায় গিয়ে একটি এফআইআর করেন। সেই বয়ানের প্রতিলিপি পাঠান জেলাশাসকের কাছেও।

Advertisement

দু’টি অভিযোগপত্রে ফারাক কোথায়?

প্রশাসন সূত্রের খবর, দীনবন্ধুবাবুর অভিযোগের প্রথম প্রতিলিপিতে ধীমান রায়-সহ ২৫ জন অজ্ঞাতপরিচয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। পরের অভিযোগে (২৮ মার্চ) বিধায়কের নাম নেই। দুই অভিযোগপত্রের ফারাক নিয়ে এই বিভ্রান্তি দূর করতেই বিডিওকে গোটা ঘটনাটা নতুন করে লিখিত ভাবে জমা দিতে বলা হয়েছে বলে সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক সঞ্জয় বনশল জানিয়েছেন। পাশাপাশি, বিডিওর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অশোকনগর থানা কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা জেলা পুলিশ সুপারকে জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

Advertisement

এ দিন রাজ্যের যুগ্ম মুখ্য নির্বাচনী অফিসার জয়দীপ গঙ্গোপাধ্যায়ও বলেন, ওই বিষয়ে জেলাশাসকের রিপোর্ট কমিশনের কাছে পৌঁছেছে। ওই রিপোর্টে বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের কথা জানিয়েছেন জেলাশাসক। কমিশন সূত্রের খবর, জেলাশাসক নিজেও এ দিন দীনবন্ধু গায়েনের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিডিও তাঁর অভিযোগ নিয়ে দোদুল্যমানতার মধ্যে রয়েছেন বলে জেলাশাসক তাঁর রিপোর্টে জানিয়েছেন। রবিবার অবশ্য দীনবন্ধুবাবু বলেছিলেন, “যা ঘটেছে, বিধায়কের উপস্থিতিতেই হয়েছে। হয়তো অভিযোগপত্রে ভাষাগত কোনও ত্রুটি থেকে গিয়েছে।”

দীনবন্ধুবাবুর অভিযোগের ভিত্তিতে রবিবারই গ্রেফতার হন দশ জন তৃণমূলকর্মী। সরকার পক্ষের কোনও আইনজীবী আদালতে না থাকায় রবিবারই তাঁদের জামিন হয়ে যায়। সোমবার আরও পাঁচ তৃণমূল কর্মী গ্রেফতার হন। বারাসত আদালতে এ দিন অবশ্য সরকারি আইনজীবী বিকাশরঞ্জন দে হাজির ছিলেন। তিনি সওয়াল করেন, রবিবার একই মামলায় দশ জন জামিন পেয়েছেন। তা ছাড়া, বিডিওর এফআইআর-এ কারও নামে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে ধৃতদের শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। শুনানি শেষে মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট মধুমিতা রায় ধৃত পাঁচ জনের জামিন মঞ্জুর করেন।

সরকারি জায়গা থেকে তৃণমূলের পোস্টার-ব্যানার সরানোকে কেন্দ্র করেই গোটা ঘটনার সূত্রপাত। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মেনেই পোস্টার-ব্যানার সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন দীনবন্ধুবাবু। কিন্তু বিরোধী দলের পোস্টার-ব্যানার না সরিয়ে কেন তৃণমূলের ক্ষেত্রেই এমন আচরণ করা হচ্ছে, সেই কৈফিয়ৎ চেয়ে ধীমানবাবু গত ২৪ মার্চ বিডিওকে ফোন করেছিলেন বলে অভিযোগ। দু’জনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। ধীমানবাবুর দাবি, কথা বলতে বলতেই তাঁর ফোন কেটে দেন বিডিও। আবার বিডিও-র অভিযোগ, ২৫ মার্চ লোকজন নিয়ে বিডিও অফিসে চড়াও হন বিধায়ক। সেখানে তাঁকে হেনস্থা করা হয় বলে দীনবন্ধুবাবু পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

বিধায়ক ধীমান রায়কে অবশ্য এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। জেলা পুলিশ সূত্রের খবর, ধীমানবাবুকে এখনও জেরাই করা হয়নি। তবে পুলিশ যে তাঁর সঙ্গে কথা বলবে, তা এ দিন জানিয়ে দিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরী। তিনি বলেন, “গোটা ঘটনায় বিধায়কের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওঁর সঙ্গেও কথা বলা হবে।” এ দিন ধীমানবাবু অবশ্য বলেছেন, “পুলিশ আমাকে জানিয়েছে, বিডিও-র অভিযোগে আমার নাম নেই। অতএব আমার চিন্তার কোনও কারণ নেই।”

অবশ্য এই ঘটনা নিয়ে কথা বলার জন্যই এ দিন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায় রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের সঙ্গে দেখা করেন। পরে তিনি বলেন, “ধীমানবাবুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মিথ্যা। তাঁর ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা হচ্ছে।” উত্তর ২৪ পরগনার জেলা পর্যবেক্ষক, রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, “তৃণমূলকর্মীদের গ্রেফতার করা ঠিক হয়নি। ধীমান অত্যন্ত ভাল ছেলে। কোনও দিনই মুখ তুলে কথা বলে না।” খাদ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, “বিডিও-র ঘরে একসঙ্গে ২৫ জন লোক গোলমাল করল। কী ভাবে তিনি তার মধ্যে ১৫ জনকে শনাক্ত করলেন? তাদের পরিচয়ই বা তিনি কী ভাবে পেলেন? এর পিছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি রয়েছে।”

এই ঘটনা প্রসঙ্গে এ দিন মেদিনীপুরের জনসভায় চক্রান্তের অভিযোগ এনেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। তিনি বলেন, “দল বেঁধে আমার বিরুদ্ধে হিংসুটেপনা শুরু করেছে। হিংসুটের কি কোনও ওষুধ আছে? আছে, বিছুটিপাতা লাগিয়ে দিন।” অন্য রাজ্যের তুলনা টেনে তিনি বলেন, “গুজরাত, রাজস্থান, মহারাষ্ট্রে সব কাট-আউট ঝুলছে। আর আমাদের এখানে সব নামিয়ে নিচ্ছে। মমতা ব্যানার্জির ছবি ফেলে দিতে পারো, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে মমতা ব্যানার্জিকে সরাতে পারবে না।”

বিরোধীরা অবশ্য অভিসন্ধির অভিযোগ অস্বীকার করছেন। হাবরা-২ ব্লক বারাসত লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। এই কেন্দ্রের ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী মোর্তাজা হোসেন বলেন, “বিডিও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ পালন করেছিলেন। কিন্তু ওঁর অফিসে বিধায়ক লোকজন নিয়ে ঢুকে যে ভাবে চড়াও হয়েছেন, তা অত্যন্ত আপত্তিকর।” সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নেপালদেব ভট্টাচার্যের মন্তব্য, “বিডিও না জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক কে ঠিক বলছেন, নির্বাচন কমিশনকেই তা ঠিক করতে হবে। তবে আমাদের সমর্থন বিডিও-র দিকেই থাকবে।”

বিডিও দীনবন্ধু গায়েন নিজে কী বলছেন? সোমবার একটা কথাই শুধু বলেন দীনবন্ধুবাবু, “আমার আর ভাল লাগছে না!”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement