চিকিৎসক নিধুরঞ্জন মণ্ডল ও বিমান চক্রবর্তী। নিজস্ব চিত্র
এক জন নব্বই ছুঁইছুঁই। আর একজন তিয়াত্তর। করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা এই বয়সেও টলাতে পারেনি তাঁদের। রোগীদের পরিষেবা দিতে নিয়মিত হাসপাতালে যাচ্ছেন, অস্ত্রোপচার করছেন ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালের দুই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিমান চক্রবর্তী (৮৯) এবং নিধুরঞ্জন মণ্ডল (৭৩)।
শনিবারই ঠাকুরপুকুর হাসপাতালে জরায়ুর ক্যানসারে আক্রান্ত এক রোগীর অস্ত্রোপচার ছিল। তিন ঘণ্টা অস্ত্রোপচার চলাকালীন পুরোটাই হাজির ছিলেন দুই চিকিৎসক। নবীনদের কাছে এটা দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন চিকিৎসক সমাজ। বিশেষত যখন করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় এখনও ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ রেখেছেন চিকিৎসকদের একাংশ। বস্তুত সংক্রমণের ভয়ে এক্স-রে, ইসিজি করতেও যে অনেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন, চিকিৎসকদেরই একাংশ জানাচ্ছেন সেই কথা। জ্বর-সর্দি-কাশি শুনলেই রোগীকে অন্যত্র রেফার করা হচ্ছে।
সম্প্রতি রাজ্যের সাতটি চিকিৎসক সংগঠন, বেসরকারি হাসপাতালগুলির সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল, করোনা আবহে রোগীদের হয়রানি। যে কারণে কোভিড এবং নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের উদ্দেশে রাজ্য সরকারকে মৌখিক নির্দেশ জারি করতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘ইনসেনটিভ’ ঘোষণা করা হয়েছে।
অথচ এই আবহেই উননব্বই বছর বয়সে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন চিকিৎসক বিমান চক্রবর্তী। ১৯৫৩ সালে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতক। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এই শিক্ষক-চিকিৎসক অবসরের পরে ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালে যোগ দেন। তাঁর কথায়, ‘‘সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেই চিকিৎসক হিসেবে আমার কাজ করতে হবে। তা থেকে বিচ্যুত হওয়ার প্রশ্ন নেই।’’ প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র জানান, তাঁদের আদি বাড়ি ছিল দিনাজপুরে। অধুনা বাংলাদেশ। স্বাধীনতার বছর খানেক আগে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। ১৯৭২ সালে বাবা বীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে বাংলাদেশ থেকে এ দেশে আনতে চেয়েছিলেন। ‘‘আমাদের
তিন পুরুষ ডাক্তার। বাবাকে যখন বললাম চলে আসার জন্য, বাবা বললেন এখনও এখানে তেমন ডাক্তার নেই। আমার যাওয়াটা ঠিক হবে না! বাবা-দাদুর কাছ থেকেই শিখেছি, কোনও অবস্থাতেই কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হতে নেই।’’ সেই আদর্শ নিয়ে ৮৯ বছরেও রোগীর সেবায় ব্রতী চিকিৎসক বলেন, ‘‘এমন মহামারি আমার কাছেও নতুন। বয়স হলেও শেখার অভ্যাসটা ছাড়তে পারিনি।’’
সেই শেখার মন্ত্রেই এগিয়ে চলেছেন ৭৩ বছরের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নিধুরঞ্জনও। ১৯৭২ সালে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতক। মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র থাকাকালীনই রোগীর সেবায় কী ভাবে অবিচল থাকতে হয়, সেই মানসিকতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘‘সতর্ক নিশ্চয় থাকব। পিপিই, ফেস শিল্ড, মাস্ক ব্যবহার করব। রোগী প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। তা হলে রোগীরা যাবেন কোথায়? পরিস্থিতি যেমনই হোক কাজ বন্ধ রাখা যাবে না।’’
ওঁদের দেখে প্রাণিত হচ্ছেন অন্যরাও। সরোজ গুপ্ত ক্যানসার সেন্টার অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর অর্ণব গুপ্ত বলেন, ‘‘অনেক কমবয়সি ডাক্তারকে দেখছি, সামান্য এক্স-রে করতেও এখন ভয় পাচ্ছেন। সেখানে এই বয়সেও যে ভাবে দুই চিকিৎসক কাজ করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণা জোগায়।’’
আরও পড়ুন: আজ ফের কমতে পারে বাস, আশঙ্কা দুর্ভোগের