নেশায় মজছে শহরের গলি

হাত থেকে হাতে ঘুরছে লাল-কালো জল। শিকড়ের ধোঁয়ায় ঠেক জমজমাট। লিখছেন সব্যসাচী ইসলাম।দ্বিতীয় গেট দিয়ে ঢুকেই অন্ধকার থেকে কানে এল একদল ছেলের ফিসফিস আওয়াজ। ‘‘ঢাল ঢাল, সমান সমান ঢালিস!’’ কেউ বলছে, ‘‘আমার এক পেগ হয়েছে। আরেকটা দে। বেশ কড়া হয়েছে।’’ মোদো গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে। ফের শোনা গেল, ‘‘দে না আমাকে। দে, আমি একবার দম দিই।’’

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:৫৫
Share:

রাত তখন ১১টা হবে।

Advertisement

রামপুরহাট হাসপাতাল এলাকা।

দ্বিতীয় গেট দিয়ে ঢুকেই অন্ধকার থেকে কানে এল একদল ছেলের ফিসফিস আওয়াজ। ‘‘ঢাল ঢাল, সমান সমান ঢালিস!’’ কেউ বলছে, ‘‘আমার এক পেগ হয়েছে। আরেকটা দে। বেশ কড়া হয়েছে।’’ মোদো গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে। ফের শোনা গেল, ‘‘দে না আমাকে। দে, আমি একবার দম দিই।’’

Advertisement

কিসে দম দিচ্ছে ওরা? গাঁজা না চরস তা ঠিক বোঝা গেল না।

রামপুরহাট চালধোয়ানি পুকুর পাড়। সন্ধে সাড়ে সাতটার আশপাশ।

একদল যুবক ছেলে, ব্লেড দিয়ে হাত একটা অংশ চিরে পকেট থেকে টিউব বার করে হাতের কাটা অংশে লাগিয়ে নিল, তার পর ঝিমোতে লাগল। দেখে মনে হল স্কুল-কলেজের ছাত্র। তার ঠিক কিছুটা দূরে দেখা যাচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। হঠাৎ কেউ সিটি দিল যেন! মুহূর্তে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেল! পুলিশের গাড়ি আসতে দেখে, সকলে দে ছুট। এ কেবল রামপুরহাটের রাতের ছবি নয়, দিনেরবেলাতেও একই দৃশ্য।

নেশা ঝিমঝিম এ শহরে দিনের বেলা রেল কোয়ার্টারের পাশে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা সামনের দোকান দিয়ে আড়াল হয়ে রয়েছে। সেখানে একজন তরুণ আর এক জনের হাতে সিরিঞ্জ দিয়ে ইঞ্জেকশন দিচ্ছে। চোখাচোখি হতেই হেসে সরে গেল। এই স্টেশন চত্বরই রাত নামলে যেন নেশার আখড়া। অন্ধকারে দিব্য মেলে হেরোইন-ও।

অবাক হবেন না, এমন বিচিত্র নেশাতেই বুঁদ রামপুরহাট।

রামপুরহাট শহরের যত্রতত্র অবাধে চলছে নেশার কারবারও। নেশার সামগ্রী মদ, গাঁজা, চরস তো রয়েইছে, রমরমিয়ে চলছে রাসায়নিক নেশার কারবারও— কাফ সিরাপ, ওষুধ-সহ বিভিন্ন সিডিউল এইচ-১ ড্রাগ, হেরোইন সবই। নেশাড়ুদের থেকে জানা গেল, এই কারবারের ব্যবহার করা হয় সাংকেতিক নাম। ওষুধের দোকানগুলিতে ‘চাকা’ চাইলে মিলে যায় ঘুমের বড়ি। আর তা বিনা প্রেসক্রিপশনেই। সেই ওষুধের খান তিনেক খেয়ে ফেললে সাধারণ মানুষের এখন-তখন অবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু নেশাড়ুরা অনায়াসেই ৮-১০টি ট্যাবলেট খাবারের মধ্য ভরে খেয়ে ফেলতে পারে।

এক নেশার ঠেকে মিলল ইঞ্জেকশন নেওয়ার ছবি। নিজস্ব চিত্র।

এমনই আর এক বিপজ্জনক নেশা হল পেটে ব্যথার ইঞ্জেকশন। সাংকেতিক নাম ‘জল’। নেশাড়ুদের থেকে জানা গেল, ফটকদুয়ারের কাছের বা হাসপাতালের সামনের ওষুধের দোকানগুলিতে মেলে এই ইঞ্জেকশন। পাওয়া যায় হাসপাতালের দালালদের থেকেও। এমনিতে এই ইঞ্জেকশনের দাম ৫টাকা ৫৮ পয়সা বা ১৯ টাকা ৭০ পয়সা। কিন্তু নেশাড়ুদের কাছে বিক্রি হয় ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। স্টেশনের পাশে এক মহিলাও এই ইঞ্জেকশন বিক্রি করে থাকেন বলে তারা জানাল। গাঁজা-চরসও পাওয়া যায় স্টেশন চত্বরেই।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, পুলিশ সাধারণত টুকটাক গাঁজাখোর বা মাতাল পাকড়াও করে থাকে। তাঁদের অভিযোগ, শহরে অলিতে গলিতে ঢালাও বিক্রি হচ্ছে বেআইনি মদ। স্টেশন চত্বরের খাবার হোটেলেও বিক্রি হচ্ছে মদ। প্রকাশ্যে বসছে গাঁজার আসর। কিন্তু সে দিকে নজর নেই পুলিশ কিংবা রেল সুরক্ষা বাহিনীর।

রামপুরহাট ভাঁড়শালা পাড়ার বাসিন্দা সুরেশ মণ্ডল এবং থানা পাড়ার বিধান দে বলেন, ‘‘সন্ধ্যার পর থেকেই গাঁজার গন্ধে পাড়ার মোড়ের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সঙ্গে রয়েছে নেশাড়ুদের নিজেদের মধ্যে ঝুট ঝামেলা। কিন্তু নজর নেই প্রশাসনের।’’

ড্রাগ কন্ট্রোল ইন্সপেক্টর বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ও এই অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, জেলার মধ্যে রামপুরহাট মহকুমাকে তাঁরা পাখির চোখ হিসাবে দেখছেন। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু দোকানকে বেআইনি ভাবে ওষুধ বিক্রির জন্য তাঁরা চিহ্নিত করে ফেলেছেন বলে বিশ্বজিৎবাবু দাবি করেন। তিনি জানান, এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।

বেঙ্গল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের রামপুরহাট জোনের সম্পাদক সুদীপ মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, সিডিউল এইচ-১ ড্রাগ বিক্রির নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। রেজিস্টার্ড ডাক্তারের বৈধ প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে এই শ্রেণির ওষুধ কিনতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী বিক্রেতাকেও এর জন্য রসিদ দিতে হয় এবং রেজিস্টারে বিক্রির খতিয়ান লিখে রাখতে হয়। সুদীপবাবু বলেন, ‘‘যে সমস্ত ওষুধের দোকান থেকে অবৈধ ভাবে সিডিউল এইচ-১ ড্রাগ বিক্রি হচ্ছে কোনও পরিস্থিতিতেই সংগঠন তাদের পাশে দাঁড়াবে না।’’ এ দিকে রামপুরহাট হাসপাতাল চত্বরের ওষুধের দোকানগুলির মালিকদের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে সাদা কাগজে পেটে ব্যথার ইঞ্জেকশনের স্লিপ নিয়ে অনেক ক্রেতা হাজির হচ্ছেন। হাসপাতাল সুপার সুবোধকুমার মণ্ডল জানান, কোনও ডাক্তার স্লিপে ওষুধের নাম লিখে রোগীকে দিলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

(সহ প্রতিবেদন: অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement