ভুয়ো ফোনে চলছেই কার্ডের তথ্য হাতানো

বার বার অচেনা নম্বর থেকে একটি ফোন পাচ্ছিলেন হাওড়ার অনিতা কোলে। তাঁর এসবিআই এটিএম কার্ডের তথ্য এবং ‘ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড’ হাতাতে জালিয়াতদের খপ্পরে পড়েছেন বুঝে ফোন কেটে দেন তিনি। কিন্তু বুধবার আবারও ফোন করে দেওয়া হয় অশ্লীল গালিগালাজ। শুধু অনিতাদেবীই নন, জালিয়াতদের শিকার হচ্ছেন আরও অনেকে। একই অভিজ্ঞতা হয়েছে কলিন স্ট্রিটের মহম্মদ মুনিরের।

Advertisement

শিবাজী দে সরকার ও মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:০৬
Share:

বার বার অচেনা নম্বর থেকে একটি ফোন পাচ্ছিলেন হাওড়ার অনিতা কোলে। তাঁর এসবিআই এটিএম কার্ডের তথ্য এবং ‘ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড’ হাতাতে জালিয়াতদের খপ্পরে পড়েছেন বুঝে ফোন কেটে দেন তিনি। কিন্তু বুধবার আবারও ফোন করে দেওয়া হয় অশ্লীল গালিগালাজ।

Advertisement

শুধু অনিতাদেবীই নন, জালিয়াতদের শিকার হচ্ছেন আরও অনেকে। একই অভিজ্ঞতা হয়েছে কলিন স্ট্রিটের মহম্মদ মুনিরের। মুনিরসাহেব বলেন, ‘‘এসবিআই সদর দফতর থেকে ফোন করছি বলে অচেনা নম্বর থেকে আমাকে এক জন ফোন করে এটিএম কার্ডের নম্বর নিতে চায়। ফোনে সাড়া না দেওয়ায় বড়সড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেলেও গালিগালাজ থেকে রক্ষা পাইনি। নাগাড়ে গালিগালাজ দিতে থাকে।’’

লালবাজারের গোয়েন্দারাও স্বীকার করেছেন, ফোনে এটিএম কিংবা ক্রেডিট কার্ডের তথ্য এবং ‘ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড’ হাতিয়ে জালিয়াতির ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ দেওয়াটা নতুন।

Advertisement

মনোজ, মুনির বা অনিতাদেবীই শুধু নন। পুলিশ সূত্রের খবর, ওই জালিয়াতদের ফোন পাননি এমন গ্রাহক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এবং জালিয়াতদের চাহিদামতো তথ্য না দিলে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের গালিগালাজের মুখে পড়তে হচ্ছে।

কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাঙ্কেরও দায় আছে বলে দাবি করছেন গ্রাহকরা। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে। কিন্তু ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ জালিয়াতির দায় গ্রাহকদের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার কলকাতা সার্কেলের সার্ভুল্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন-এর ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক কাবেরী দাস বলেন, ‘‘কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাঙ্কের কোনও দায় নেই। ব্যাঙ্কের তরফে সচেতন করা সত্ত্বেও গ্রাহকরা নিজেদের ভুলে এটিএম কার্ডের নম্বর জালিয়াতদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।’’

যদিও গ্রাহকরা বলছেন, জালিয়াতরা এটিএম কার্ডের নম্বর আগে থেকে জেনে নিয়েই ফোন করে। তা হলে ওই নম্বর দেয় কে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জালিয়াতরা এসবিআই-এর নাম করেই ফোন করছে। প্রতারিতদের অভিযোগ, জালিয়াতদের কাছে মজুত থাকছে ব্যাঙ্কের তথ্যও। ওই তথ্য কী করে প্রতারকদের হাতে আসছে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রতারিতরা। মাস কয়েক আগেই এসবিআইয়ের ক্রেডিট কার্ড প্রতারণার শিকার হয়েছেন ব্যারাকপুরের এক বাসিন্দা। তাঁর কথায়, ‘‘জালিয়াতরা ফোন করে এটিএম কার্ড নম্বর, ফোন নম্বর, ঠিকানা সব গড়গড় করে বলে দিচ্ছে। ব্যাঙ্ক থেকে আমার তথ্য জালিয়াতদের হাতে যাচ্ছে কী ভাবে?’’ প্রায় ২৪ হাজার টাকা প্রতারণার পরে ওই কার্ড পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে অনুরোধ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ৭ মাস কেটে গেলেও সেটা নিয়েও কিছু জানায়নি ব্যাঙ্ক।

জালিয়াতদের ধরতে না পারলেও ফোন নম্বর থেকে পুলিশ সূত্র পাচ্ছে না কেন?

লালবাজার বলছে, সব ঘটনার তদন্ত করেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাসখানেক আগেই এই রকম অপরাধের সঙ্গে যুক্ত পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই অপরাধের উৎসে পৌঁছতে পারেনি পুলিশ।

গোয়েন্দা সূত্রের খবর, যে নম্বর থেকে জালিয়াতরা ফোন করে তা মূলত বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের নম্বর। মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে ভুয়ো পরিচয়পত্র দিয়ে ওই নম্বরের সংযোগগুলি নেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দাদের ব্যাখ্যা, জালিয়াতির ক্ষেত্রে ফোন করার পরেই সিম কার্ডটি নষ্ট করে ফেলা হয়। একটি সিমকার্ড জালিয়াতরা তিন থেকে চার দিনের বেশি ব্যবহার করে না। সেই সঙ্গে ওই নম্বর ‘ট্র্যাক’ করে অপরাধীদের সূত্রে পৌঁছনো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এক তদন্তকারী অফিসার বলেন, ‘‘ভিন্ন রাজ্যের নম্বর হওয়াতে আমাদের ডিটেলস পেতে বেগ পেতে হয়। ওই ডিটেলস পাওয়ার পর আমরা যখন তল্লাশি শুরু করি, তত ক্ষণে জালিয়াত ওই সিম নষ্ট করে ফেলেছে।’’

তদন্তকারীদের দাবি, বেশির ভাগ সময়ে তাঁরা দেখেছেন ভুয়ো প্রমাণপত্র দিয়ে ওই নম্বরগুলি চালু (অ্যাক্টিভেট) করা হয়েছে। তা হলে কেন ওই সার্ভিস প্রোভাইডারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

লালবাজারের এক তদন্তকারী অফিসার জানান, সার্ভিস প্রোভাইডারদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে এ ব্যাপারে। কিন্তু তাতেও কাজের কাজ হচ্ছে না। নতুন নম্বর চালু করার ক্ষেত্রে শিথিলতা থেকে যাচ্ছে বলেই মেনে নিয়েছেন তদন্তকারীরা। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান পল্লবকান্তি ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটিতে আছেন বলে জানিয়েছেন। বেসরকারি মোবাইল সংস্থার এক প্রতিনিধি বলেন, ‘‘আমাদের ভেরিফিকেশন শেষ করার পরেই নতুন নম্বর চালু করা হয়।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement