—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
বছর দুয়েক আগের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ দমদমের সুভাষনগরে এক তৃণমূল কর্মীর ভাইকে খুনের ঘটনায় তৃণমূলেরই একাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। উত্তাল হয়ে উঠেছিল দমদমের রাজনৈতিক মহল। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, এলাকার দখলদারি এবং প্রোমোটারি সংক্রান্ত বিবাদের জেরেই ওই ঘটনা ঘটে। শাসকদলের নেতাদের দাবি ছিল, ওই খুনের ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক কোনও বিরোধ নেই। দু’টি বিরোধী গোষ্ঠীর বিবাদের জেরেই ওই ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন তাঁরা।
এর পরে সম্প্রতি দক্ষিণ দমদমে এক ব্যক্তির অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় পুরপ্রতিনিধির ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছিল ওই ব্যক্তির পরিবার। আবার, একটি জলাশয় ভরাটের চেষ্টা হচ্ছে, এমন অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবাদ করলে শাসকদলের এক মহিলা পুরপ্রতিনিধিকে দলের কর্মীরাই হেনস্থা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
শাসকদলের নেতাদের একাংশের অবশ্য দাবি, ‘শান্তিপূর্ণ’ দক্ষিণ দমদমে উপরের তিনটিই ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা। যদিও বিরোধীদের অভিযোগ, বিচ্ছিন্ন নয়, এমন ঘটনা সেখানে প্রায়ই ঘটছে। তাঁদের আরও দাবি, দক্ষিণ দমদমের সর্বস্তরে সিন্ডিকেট ব্যবস্থা কায়েম করেছে শাসকদল। তাই সেখানে ক্ষমতার দড়ি-টানাটানিতে কায়েমি স্বার্থে আঘাত লাগলেই ঘটে যাচ্ছে এমন সব ঘটনা। যা শুনে তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, সবটাই অপপ্রচার।
রাজনৈতিক কাজিয়া যতই তীব্র আকার নিক, খুনোখুনি বা মারামারির পিছনে অধিকাংশ সময়েই থাকে টাকাপয়সা অথবা এলাকা দখল সংক্রান্ত কোনও কারণ। ভোটের মুখে হাওড়ার পিলখানায় প্রকাশ্যে এক প্রোমোটারকে গুলি করে খুনের ঘটনায় যা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। সেই সূত্রেই দমদমের স্থানীয় স্তরের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে এমনই সব ঘটনার প্রসঙ্গ। এরই মধ্যে শাসকদলের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অভিযোগে বাড়তি গুরুত্ব যোগ করেছে সাম্প্রতিক একটি ‘ছোট্ট’ ঘটনা। সম্প্রতি দমদম, উত্তর দমদম এবং রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্র এলাকার তৃণমূলের কোঅর্ডিনেটর প্রবীর পালকে ব্যারাকপুর কমিশনারেটের তরফে ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী দেওয়া হয়েছে। এতেই প্রশ্ন উঠেছে, ভোটের অঙ্কে বিরোধীরা এই এলাকায় নিতান্তই দুর্বল। তা হলে প্রবীরের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা কেন? বিরোধীরা বলছেন, মারছে তৃণমূল, মরছেও তৃণমূল। প্রবীরের যদিও দাবি, ‘‘আমি নিরাপত্তা চাইনি। এটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। ভোটের আগে আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই বিরোধীরা অবান্তর অভিযোগ করছেন। এখানে তৃণমূলের কোনও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নেই।’’
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানাচ্ছেন, নির্মাণ ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত যেন গলা টিপে ধরেছে গোটা দমদমের। বিরোধীদের দাবি, সেই ব্যবসাকে সামনে রেখে চালানো হচ্ছে নানা ধরনের সিন্ডিকেট, যা দমদমকে টাকার খনিতে পরিণত করেছে। সেই টাকার ভাগাভাগি ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে এলাকার রাজনীতি। তৃণমূলের পাল্টা দাবি, বাম আমলে দমদম তটস্থ হয়ে থাকত বোমা, গুলির ভয়ে। দাপট চলত শুধু বাহুবলীদের। সেই দমদম এখন উন্নয়ন এবং সংস্কৃতির ‘রাজধানী’। কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে ঠিকই, তাতে দল এবং প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও করেছে।
এলাকার বিজেপি নেতা গৌতম সাহা মণ্ডলের অভিযোগ, ‘‘নির্মাণ ব্যবসা থেকে শুরু করে সর্বত্র ‘প্রণামী আদায়’ এমন পর্যায় পৌঁছেছে যে, দাবি না মানলেই বিপদ।’’ আগে বাহুবলীরা দাপট দেখাত, বর্তমানে ব্যবস্থা পাল্টেছে। স্থানীয় সূত্রের খবর, এখন ওয়ার্ডভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যার মাথায় রয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। সিপিএম নেতা পলাশ দাসের কথায়, ‘‘প্রভূত অর্থ রোজগারই যেখানে মুখ্য, সেখানে ক্ষমতা ধরে রাখার তাগিদ তারই অনুসারী। উপর থেকে নীচ পর্যন্ত চলে দুর্নীতি। তাই ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দলীয় কোন্দলও প্রত্যাশিত। দমদম তার ব্যতিক্রম নয়।’’ তৃণমূল নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবার দাবি, ‘‘বাম জমানার তুলনায় অপরাধ এখন অনেকটাই কমেছে। একটি-দু’টি ঘটনাও কাম্য নয়। কিন্তু তার জন্য দলকে এ ভাবে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। এগুলি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার।’’ বিজেপির জাতীয় পরিষদের সদস্য অরিজিৎ বক্সীর কথায়, ‘‘নির্মাণ ব্যবসাই এই সব হঠাৎ বড়লোক হওয়া রাজনীতিকের আয়ের প্রধান উৎস। সেই আয়ের পথে বাধা এলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী।’’
দমদমের অন্যত্রও কম-বেশি অভিযোগ শোনা যায়। যেমন, বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে, কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন উত্তর দমদম পুর এলাকা। সেখানেও চলছে সিন্ডিকেট নিয়ে দাপাদাপি। সেখানেও অভিযোগের তির শাসকদলের দিকে। উত্তর দমদম পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান, সিপিএমের সুনীল চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘কোনও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না শাসকদল। কারা এখানকার সুবিধাভোগী, সকলেরই জানা।’’ যদিও অভিযোগ খারিজ করে উত্তর দমদম পুরসভার বর্তমান চেয়ারম্যান, তৃণমূলের বিধান বিশ্বাস বলেন, ‘‘আমরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে কী অভিযোগ উঠেছে? কেউ একটা অভিযোগ দেখান। সিন্ডিকেট সংক্রান্ত কোনও গোলমাল এখানে হয়নি। বিরোধীদের কোনও জনসংযোগ নেই। উন্নয়ন দেখতে পান না ওঁরা।’’
কার্যত একই সুরে দমদম পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান বরুণ নট্ট বললেন, ‘‘দমদম পুর এলাকায় বহুতল নিয়ে কোনও অভিযোগ মেলেনি। দমদমে উন্নয়নের, সংস্কৃতির জোয়ার বইছে। সেটা বুঝতে পেরেই ভোটের আগে ভেসে থাকতে বিরোধীদের এ সব মিথ্যা অপপ্রচার চলছে।’’ (চলবে)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে