Iran-Israel Conflict

পর পর বীভৎস আওয়াজ, শুনলাম ইরান মিসাইল ফেলছে, কী হবে‌ কে জানে! কুয়েতে বসে গাইঘাটার মুখগুলো মনে ভাসছে

বাড়ির লোকজন অনেক বার ফোন করছে। ওরাও খুব ভয় পেয়েছে। বললাম, চিন্তা কোরো না। মুখে বলছি। চিন্তা যাচ্ছে না। বাড়ি কখন যাব, জানি না। কাজ শেষ হলে যেতে পারব কি না, জানি না।

Advertisement

বিধান ভৌমিক

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:৫৬
Share:

পশ্চিম এশিয়ায় কি বেজেছে যুদ্ধের দামামা! শনিবার ক্ষেপণাস্ত্র ফেলেছে ইরান। ছবি: রয়টার্স।

সকালে অফিসে কাজ করছিলাম। হঠাৎই বিকট শব্দ। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো টায়ার ফেটেছে। কেমন হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি! কী হচ্ছে? কোথায় হচ্ছে? তার পরেই মনে পড়ে যায়। শনিবার সকালে কাজে এসেই শুনেছিলাম ইরানের সঙ্গে আমেরিকা, ইজ়রায়েল যুদ্ধ করছে। বুঝে যাই! কুয়েত সিটিতে আমেরিকার সেনাঘাঁটিতে ইরান মিসাইল মেরেছে! সেই থেকে অফিসেই বসে রয়েছি। মাঝে মাঝে সাইরেন বাজছে। বুকটা ধুকধুক করছে। গাইঘাটার বাড়ির কথা মনে পড়ছে। রাস্তায় গাড়ি চলছে না। রমজানের জন্য দোকানপাট এমনিতেই বন্ধ। কাজ শেষে বাড়ি কখন ফিরব, জানি না।

Advertisement

রমজানের সময় কুয়েতের অফিসে দু’দফায় ডিউটি থাকে। সকালে দু’ঘণ্টা অফিসে কাজ চলে। তার পরে আবার ৫টার পরে ইফতার শেষে সকলে কাজে যায়। আমাদের বিএমডব্লিউ অফিসেও সেই নিয়ম। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় কাজে গিয়েছিলাম। আচমকা একটা বিকট শব্দ। তার পরে আরও তিন-চারটে শব্দ। কানের পর্দা যেন ফেটে গেল! প্রথমে কেঁপে উঠেছিলাম। কী হল, ভাবব কী! মাথাই কাজ করছিল না। মনে হল অনেকগুলো টায়ার ফাটল একসঙ্গে। তার পরে বুঝলাম, টায়ার-ফায়ার নয়। ইরান মিসাইল মেরেছে। গলাটা শুকিয়ে গেল।

কুয়েত সিটিতে আমেরিকার সেনাঘাঁটি রয়েছে। বুঝতে পারি, ওখানেই মিসাইল পড়েছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল বাঁচব তো! ভেবেই বা কী করব? কুয়েত সরকার এখনও কিছু জানায়নি। অফিসে লোকজনের কাছ থেকে শুনলাম, আমেরিকার ঘাঁটিতে মিসাইল ছুড়েছে ইরান। শুধু কুয়েতে নয়, পশ্চিম এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশে আমেরিকার ঘাঁটিতে নাকি মেরেছে শুনলাম। আর যে ক’টা মারবে, জানি না! কেউ জানে না এখানে।

Advertisement

ওই বিকট শব্দের পরে রাস্তায় আর গাড়ি চলছে না। কখনও একটা হয়তো যাচ্ছে। অফিসে বসে দেখছি। অফিসের লোকজন বলছে, আমেরিকার বেসের নাকি তেমন কিছু হয়নি। খবরে কিছু দেখিনি এখনও। আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম টানা। ভয় পাচ্ছিলাম, যদি এখানেও এসে পড়ে! আকাশে দেখি কেমন ধোঁয়া-ধোঁয়া। বুঝলাম মিসাইল যাচ্ছে। অফিসের লোক বলল, আমেরিকার সেনাঘাঁটি এখান থেকে ইরানে মিসাইল ছুড়ছে। মাঝেমাঝে সাইরেন বাজছে।

অফিস থেকে বলল এখানেই এখন থেকে যেতে। এমনিতে রমজানের সময় সকালের ডিউটি করে বাড়ি চলে যাই। সন্ধ্যায় আবার আসি। আজ বাড়ি যেতে বারণ করল। বলল, ‘এখানেই থেকে যাও এখন।’ কত ক্ষণ থাকব, জানি না। কেউ বলেননি।

Advertisement

২০১৫ সাল থেকে কুয়েত সিটিতে আছি। এ রকম কোনও দিন হয়নি। বোমাবাজি শুনিনি। এখানে যে মিসাইল পড়বে, স্বপ্নেও ভাবিনি। অফিসের বস্ বলেছেন, বাড়িতে শুকনো খাবার, জল রেখে দিতে। এমনিতে রমজানের সময় দিনের বেলা কুয়েতে রাস্তাঘাটে, অফিসে কোথাও খাওয়া যায় না। ঘরে বসে খেতে হয়। তাই ঘরে শুকনো খাবারদাবার মজুত থাকে এমনিতেই। খাবার নিয়ে সমস্যা নেই। ভারতীয় দূতাবাসও এ সব নিয়ে কিছু বলেছে বলে শুনিনি।

অফিসে বসে রয়েছি। একবার আকাশ দেখছি, একবার রাস্তা। গাইঘাটার বাড়ির কথা মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরে শেষ বাড়ি গিয়েছিলাম। বাড়ির লোকজন অনেক বার ফোন করছে। ওরাও খুব ভয় পেয়েছে। বললাম, চিন্তা কোরো না। মার্কিন ঘাঁটিতে বোমা ফেলেছে। তা-ও তেমন কিছু হয়নি। মুখে বলছি। চিন্তা যাচ্ছে না। কী করব বুঝে পাচ্ছি না। আপাতত কাজ করছি। আকাশ দেখছি। রাস্তায় গাড়ি চলছে কি না দেখছি। বাড়ি কখন যাব, জানি না। কাজ শেষ হলে যেতে পারব কি না, জানি না।

(লেখক কর্মসূত্রে গত ১৫ বছর ধরে কুয়েত সিটিতে থাকেন। আদতে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার বাসিন্দা।)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement