অফিসের টেবিলে ব্যাগ রয়েছে। হাজিরা খাতায় সই-ও আছে। কিন্তু, কর্মীর দেখা নেই। মুখ্যমন্ত্রীর উত্তরবঙ্গের সচিবালয় ‘উত্তরকন্যা’ কিংবা হাওড়ার ‘নবান্ন’, বা ধরুন বিএসএনএল, আয়কর দফতরের ব্যস্ত অফিস— মাসের শুরুতে সর্বত্রই কমবেশি এমন ছবি। কারণ একটাই, মাস পয়লায় টাকা তোলার লাইনে তো দাঁড়াতে হবে!
তাই ‘শ্রমদিবস’ নষ্ট হলেও দফতরের প্রধান কর্মীকে শো কজও করতে পারছেন না। বরং তাঁদের এই হঠাৎ নিখোঁজ হওয়াকে সহানুভূতির চোখেই দেখা হচ্ছে। মন্ত্রী থেকে মেয়র, ডিএম থেকে বিডিও, সকলকেই লাইনে দাঁড়ানোর ঝকমারির কথা মাথায় রাখছেন।
যেমন, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। অসুস্থতার কারণে আপাতত ঘরবন্দি হলেও কোচবিহারে বসে শিলিগুড়িতে নিজের দফতরের হাজিরার হিসেব রাখছেন রোজই। তিনি বলেন, ‘‘পরিস্থিতি খুব খারাপ। তাই অফিসে ঢুকেই ব্যাঙ্কের লাইনে ছুটতে হচ্ছে কর্মীদের।’’ এতে যে কাজের ক্ষতি হচ্ছে, সেটাও মেনে নেন। ঘটনাচক্রে, এই ক্ষেত্রে তৃণমূল মন্ত্রীর সঙ্গে একসুর শিলিগুড়ির মেয়র অশোক ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, ‘‘মাসের শুরুতে হাতে টাকা না থাকলে কারও কাজে মন বসে!’’
লাইনের তাড়ায় সব অফিসেই কাজকর্ম যে শিকেয় উঠেছে, তা মানছেন অফিসের অনেক কর্তাই। পুরুলিয়ার বিএসএনএল-এর একজন আধিকারিক জানান, দু’দিন ধরে অফিসের কয়েক জন সকালে সই করেই ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। তাই দফতরের কাজে বিঘ্ন ঘটছে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কমার্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের প্রাক্তন প্রধান দেবব্রত মিত্র বলেন, ‘‘রোজই দেখি অনেককে সই করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে থাকা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়ানোর কথা ভাবতে হয়। এ ভাবে কাজ হতে পারে!’’ একই কথা উত্তরবঙ্গের প্রাক্তন উপাচার্য অরুণাভ বসু মজুমদারেরও। তিনি বলেন, ‘‘একটা দেশের মানুষকে সকালে উঠেই লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা তোলার চিন্তা করতে হবে কেন?’’
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘যাঁরা সারা মাস খেটেছেন, তাঁদের হাতে মাসকাবারি খরচ চালানোর টাকা পৌঁছে দেওয়াটা রাষ্ট্রের কর্তব্য।’’ কিন্তু সেটা হচ্ছে না। ‘‘এর ফলে বিপুল শ্রমদিবস নষ্ট হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা নষ্ট হওয়ার কুপ্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে,’’ বললেন তিনি।