বারবার ঠকিয়েও কেন পার পাচ্ছে ভ্রমণ সংস্থা

কোনও গ্রাহক প্রতারণার অভিযোগ করলেন। টানাপড়েন চলল কিছু দিন। অবশেষে টাকা মিটিয়ে আপস করে নিল ভ্রমণ সংস্থা। কিন্তু শিক্ষা নেওয়ার বালাই নেই। আবার প্রতারণা। ক্ষতিপূরণ নিয়ে আবার আইনি টানাপড়েন। শেষে ফের টাকা মেটানোর প্রতিশ্রুতি।

Advertisement

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ ০৩:৩৩
Share:

কোনও গ্রাহক প্রতারণার অভিযোগ করলেন। টানাপড়েন চলল কিছু দিন। অবশেষে টাকা মিটিয়ে আপস করে নিল ভ্রমণ সংস্থা।

Advertisement

কিন্তু শিক্ষা নেওয়ার বালাই নেই। আবার প্রতারণা। ক্ষতিপূরণ নিয়ে আবার আইনি টানাপড়েন। শেষে ফের টাকা মেটানোর প্রতিশ্রুতি।

আদালতে বারংবার প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও ওই ভ্রমণ সংস্থা রমরমিয়ে চলে কী ভাবে?

Advertisement

প্রশ্নটা উঠছে তপসিয়ার ভ্রমণ সংস্থা কান্ট্রি ভ্যাকেশনস-এর কাজকারবার নিয়ে। ওই সংস্থার পূর্বাঞ্চলীয় শাখার জেনারেল ম্যানেজার আজহার আলি বেগের দাবি, আগের তুলনায় অভিযোগ কমেছে। কিন্তু প্রতারণার অভিযোগ বারবার উঠবে কেন কিংবা আদৌ উঠবে কেন, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরেও তা থেকে শিক্ষা নিতে কেন তাঁদের অনীহা— সেই সব প্রশ্নের কোনও সদুত্তর নেই তাঁর কাছে।

অভিযুক্ত ভ্রমণ সংস্থা না-হয় শিক্ষা নেয়নি, তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না রাজ্য সরকার?

‘‘ওই সংস্থার প্রতারণা নিয়ে আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে পুলিশ ও ক্রেতা সুরক্ষা দফতরে জানাতে পারি। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই,’’ অক্ষমতা কবুল করে নিয়েছেন পর্যটনমন্ত্রী ব্রাত্য বসু।

পর্যটনমন্ত্রী অভিযোগ পাননি বলে জানালেও আদালতের তথ্য অন্য কথা বলছে। ২০১১-য় ওই সংস্থার বিরুদ্ধে ৭০ হাজার টাকা প্রতারণার অভিযোগ আনেন নাকতলার এক গৃহবধূ। ক্রেতা সুরক্ষা দফতরে অভিযোগ করেন

তিনি। সেই খবর আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশের পরে টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আপস-মীমাংসা করে সংস্থাটি। তার পরে আবার অভিযোগ। মামলা গড়ায় ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে। প্রতারিত গ্রাহকের টাকা ফিরিয়ে ক্ষতিপূরণেরও নির্দেশ দেয় আদালত।

ব্রাত্যবাবু হাত তুলে নিলেও শেষ পর্যন্ত নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা দফতর। কান্ট্রি ভ্যাকেশনসের লাইসেন্স বাতিল করতে চেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করছে তারা। ওই সংস্থার হাতে প্রতারিত মানুষজন যাতে তাঁর দফতরে যোগাযোগ করেন, তার আর্জি জানিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে বলেও জানান ক্রেতা সুরক্ষা মন্ত্রী সাধন পাণ্ডে। কী ভাবে ঠকাচ্ছে ওই সংস্থা?

ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় নামে যাদবপুরের এক বাসিন্দা ২০১২-র ডিসেম্বরে এক দিন স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন সাউথ সিটি মলে। কান্ট্রি ভ্যাকেশনসের কিছু প্রতিনিধি তখন সেখানে ছিলেন। অভিযোগ, তাঁরা ভাস্করবাবুদের ওই ভ্রমণ সংস্থার সদস্য হতে বলেন এবং বেড়ানোর ক্ষেত্রে নানা সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেন। ভাস্করবাবু জানান, ওই প্রতিনিধিদের কথায় উৎসাহী হয়ে তিনি সে-দিনই কান্ট্রি ভ্যাকেশনসের সদস্য হন। নগদ ২৩ হাজার টাকা এবং সাড়ে ২৩ হাজার টাকার চেক দেন। ভাস্করবাবুর অভিযোগ, ‘‘চুক্তির সময় আমাদের বলা হয়েছিল, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে ওই সংস্থার রিসর্ট আছে। কিন্তু মাস দেড়েক পরে আমরা বিষ্ণুপুরে যেতে চাইলে ভ্রমণ সংস্থার তরফে বলা হয়, সেখানে তাদের কোনও রিসর্ট নেই।’’

ভাস্করবাবুরা সদস্যপদ বাতিল করে টাকা ফেরত চাইলে ভ্রমণ সংস্থাটি তাতে কর্ণপাত করেনি বলে অভিযোগ। ওই গ্রাহক তখন ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের দ্বারস্থ হন। দফতরের তরফে তিন বার ডাকা হলেও ওই ভ্রমণ সংস্থার কোনও প্রতিনিধি হাজির হননি বলে অভিযোগ। ভাস্করবাবু তার পরেই কান্ট্রি ভ্যাকেশনসের বিরুদ্ধে জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা দায়ের করেন।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালত নির্দেশ দেয়, ভাস্করবাবুর পুরো টাকা এক মাসের মধ্যে ফেরত দিতে হবে কান্ট্রি ভ্যাকেশনসকে। সেই সঙ্গে মামলা চালানোর খরচ বাবদ তারা দেবে দু’হাজার টাকা। আর ভাস্করবাবুদের হয়রান করায় এবং মানসিক যন্ত্রণায় ফেলার জন্য পাঁচ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সংস্থাকে।

জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ভ্রমণ সংস্থাটি রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা দায়ের করে। ২০১৫-র ৩০ ডিসেম্বর রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের বিচারক বলেন, ‘‘অভিযোগকারী ওই ভ্রমণ সংস্থার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।’’ তিনি নিম্ন আদালতের রায়ের পুরোটাই বহাল রাখেন।

প্রতারণার অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে কান্ট্রি ভ্যাকেশনসের কর্তা আজহার জানান, রাজ্য ক্রেতা আদালতের নির্দেশ মানবেন তাঁরা।

২০১১ সালেই তো এক গৃহবধূ মামলা করায় ওই ভ্রমণ সংস্থা টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আপস-মীমাংসা করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। তার পরেও এমন অভিযোগ উঠছে কেন?

সংস্থা-কর্তা আজহার নিরুত্তর। পর্যটনমন্ত্রী কিছু করার নেই বলে জানানোর পরে ক্রেতা সুরক্ষা মন্ত্রী সাধনবাবু অবশ্য ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি জানান, যাঁরা কান্ট্রি ভ্যাকেশনসের কাছে প্রতারিত হয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা বিস্তারিত ভাবে জানতে চেয়ে শীঘ্রই সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। ‘‘কান্ট্রি ভ্যাকেশনসের লাইসেন্স বাতিল করার জন্য ক্রেতা সুরক্ষা আইনের ১২(১) ডি ধারায় মামলাও করা হচ্ছে,’’ আশ্বাস সাধনবাবুর।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement