ভদ্রেশ্বরে অস্ত্র উদ্ধার কাণ্ড

সব মিটে গিয়েছে ভেবে এলাকায় ফিরতেই পুলিশের জালে অঙ্কিত

মাঝে কেটে গিয়েছে একটা মাস। ভদ্রেশ্বর থানার চাঁপদানির খানপুকুর এলাকার নুনিয়াপট্টিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি অস্ত্র কারখানার হদিস পায় পুলিশ। উদ্ধার হয় প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম। গিরিশ সিংহ নামে কারখানার এক শ্রমিককে পুলিশ গ্রেফতার করলেও সুযোগ বুঝে বেপাত্তা হয় অস্ত্র তৈরির মূল পান্ডা অঙ্কিত দুবে। তদন্তে জানা যায়, বিহার থেকে এখানে এসে সে কলেজে ভর্তি হয়েছিল।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০১৬ ০১:৫২
Share:

বুধবার আদালতের পথে ধৃত। ছবি: তাপস ঘোষ।

মাঝে কেটে গিয়েছে একটা মাস। ভদ্রেশ্বর থানার চাঁপদানির খানপুকুর এলাকার নুনিয়াপট্টিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি অস্ত্র কারখানার হদিস পায় পুলিশ। উদ্ধার হয় প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম। গিরিশ সিংহ নামে কারখানার এক শ্রমিককে পুলিশ গ্রেফতার করলেও সুযোগ বুঝে বেপাত্তা হয় অস্ত্র তৈরির মূল পান্ডা অঙ্কিত দুবে। তদন্তে জানা যায়, বিহার থেকে এখানে এসে সে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে পড়া ছেড়ে সে এই ব্যবসায় নামে বেশি টাকা রোজগার করতে। এক মাস ধরে নানা জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার রাতে ভদ্রেশ্বরেরই অ্যাঙ্গাস এলাকা থেকে পুলিশ অঙ্কিতকে গ্রেফতার করে। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার পরই সে বিহারের গোরক্ষপুরে নিজের গ্রামে গিয়ে গা ঢাকা দেয়। এক মাস কেটে গেলে অবস্থা কিছুটা ঠান্ডা হয়েছে ভেবে সে ভদ্রেশ্বরে ফিরেছিল ফেরে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।

Advertisement

ভদ্রেশ্বরের কবি সুকান্ত কলেজের কলা বিভাগে ভর্তি হওয়া ইস্তক মন টিকছিল না বিহার থেকে আসা অঙ্কিতের। বাবা আর দাদা গোন্দলপাড়া চটকলে কাজ করেন। সামান্যই আয়। তার উপর প্রায়ই চটকলের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের লোকজনের আশা ছিল, পড়া শেষ করে ছেলে নিশ্চয় ভাল চাকরি পাবে। চটকলের শ্রমিক অধ্যুষিত এই মহল্লায় অল্প শ্রমে রোজগারের হাতছানি থাকেই। চুরি, ছোটখাটো সমাজবিরোধী কাজ থেকে নৌকায় গঙ্গা পেরিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল, ভাটপাড়ার মিশ্র এলাকাগুলিতে চলে মাদক পাচারের কারবার। গঙ্গার দুই পাড়ের সমাজবিরোধীরা অনায়াসে একে অপরের ডেরায় মিশে যায়। অপরাধ করে পুলিশের হাত এড়াতে এপার থেকে ওপারে যাতায়াতও চলে অবাধে। অল্প আয়াসে বেশি টাকা রোজগারের হাতছানি পেয়ে বসে অঙ্কিতকেও। কারণ পাড়ার ছেলেদের প্রাইভেট টিউশন দিয়ে সামান্য রোজগারে তার পোষাচ্ছিল না। ধীরে ধীরে অন্ধকার জগতে ভিড়ে যায় সে। নেমে পড়ে বেআইনি অস্ত্র তৈরি ও বিক্রির কারবারে।

চাঁপদানির শ্রমিক মহল্লার কানাগলিতে রাত হতেই সবার চোখের আড়ালে শুরু হতো অস্ত্র তৈরির কাজ। তদন্তকারী অফিসারের কথায়, ‘‘ মৃদুভাষী, পাড়ার উপকারী লেখাপড়া জানা অঙ্কিতকে কেউই সন্দেহের চোখে দেখত না। তবে প্রতিবেশী এক পরিবারের বক্তব্য, ‘‘রাত বাড়লে বাইরের লোকের আনাগোনা টের পেতাম। কিন্তু ওই যে বললাম ‘ভাল ছেলে’। খারাপ কিছু সন্দেহ করব কেন? এমনকী প্রথমটায় পুলিশ বলতেও বিশ্বাস হয়নি।!’’

Advertisement

পুলিশের দাবি, রাতে পড়শিরা ঘুমিয়ে পড়লেই চালু হত অস্ত্র কারখানার নাইট শিফট। ওয়ান শটার থেকে সেভেন এমএম, নাইন এমএমের মতো অত্যাধুনিক রিভলভার তৈরি হতো সেখানে। নির্বাচনের আগে অস্ত্রের চাহিদাও ভাল ছিল। ভোটের আগে ওইসব অস্ত্র দুষ্কৃতীদের হাতে তুলে দিতে পারলে ভাল লাভ করা যাবে, তা ভেবেই কাজ চলছিল জোরকদমে। তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল স্থানীয় দুষ্কৃতীদের। এমনকী যেদিন অস্ত্র কারাখানায় হানা দেওয়া হয়, সেদিনও সকালে সে অস্ত্র বেচতেই বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনওভাবে হানার খবর পেয়ে যাওয়ায় আর না ফিরে ভিন রাজ্যে পালায়।

পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশের নাগাল এড়াতে অঙ্কিত প্রথমে বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার ধারাহারামেলা গ্রামে লুকিয়ে ছিল। ভদ্রেশ্বর থানার পুলিশ তার মোবাইলের সূত্র ধরে সেখানে পৌঁছলেও তাকে ধরতে পারেনি। পুলিশ সেখান থেকে চলে এলে সে বিহারের গোরক্ষপুরের নিজের গ্রামে গা-ঢাকা দেয়। বুধবার তাকে চন্দননগর মহকুমা আদালতের এসিজেএম জয়শঙ্কর রায়ের এজলাসে তোলা হলে বিচারক ১০দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন।

Advertisement

ছেলে অঙ্কিত ধরা পড়ায় বাবা উপেন্দ্র দুবে হতবাক। নুনিয়াপট্টীর মালিরাম আগরওয়ালের বাড়িতে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকা উপেন্দ্র অপেক্ষায় ছিলেন ছেলে পড়াশোনা শেষে একটা চাকরি জোটাতে পারলেই তাঁর ছুটি। সোজা বিহারের গোরক্ষপুরে দেশের বাড়ি পাড়ি দেবেন। মঙ্গলবার রাতে অঙ্কিত পুলিশের জালে ধরা পড়ায় তাঁর সেই আশা আর পূরণ হল না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement