লুকিয়ে নেশার আড্ডায় তিন স্কুলপড়ুয়া। ছবি: সুশাস্ত সরকার।
রেলস্টেশন লাগোয়া সুপার মার্কেট। স্টেশনের দিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় শৌচাগারের পিছনটা আধো অন্ধকার। সেখানেই দাঁড়িয়ে দু’টি ছেলে। বয়স মেরেকেটে ১৩-১৪। জামা আর হাফ প্যান্ট পরা দু’জনের একজনের প্যান্ট কোমরে ধরে রেখেছে নারকেল দড়ি। দু’জনের হাতে দুটো পলিথিন। হঠাৎই একজন হাতের পলিথিনটা নাকের সামনে ধরে প্রাণপণে শুঁকতে থাকে। চোখমুখ কিছুটা আচ্ছন্ন। ভাল করে ঠাহর করতেই চোখে এল পলিথিনের ভিতরে আঠার টিউব। পালা করে দু’জনেই একটু পর পর শুঁকছিল নিজেদের পলিথিনটা।
শ্রীরামপুরের সুপার মার্কেটের এমন আড়ালটাই শুধু নয়, টিকিট কাউন্টারের পিছনে, শেওড়াফুলি স্টেশনের ওভারব্রিজেও প্রতিদিন চোখে পড়বে এমনই দৃশ্য। কারও হাতে পাউরুটি। তাতেই আঠা মাখিয়ে নেশার উপকরণ তৈরি করে চলছে মৌতাত। কারও মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। নতুন কিছু করার, পাওয়ার নেশায় সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া কচি মুখগুলো এ ভাবেই ঢুকে পড়ছে নেশার নিষিদ্ধ জগতে। যাদের বেশিরভাগই ঝুপড়িবাসী।
কিশোর থেকে যুবক, হুগলির মফসসল শহর শ্রীরামপুর, রিষড়া, শেওড়াফুলি, বৈদ্যবাটি, ভদ্রেশ্বর, রেল লাইনের ধার ঘেঁষে থাকা এলাকাগুলোয় যত্রতত্র হাতছানি নেশার নানা জিনিসের। যার অমোঘ টান থেকে বাদ যায়নি কলেজ পড়য়া থেকে স্কুলপড়ুয়া কেউই। কলেজ পড়ুয়াদের একাংশ আবার নেশার উপকরণ হিসাবে কাশির সিরাপেই বেশি অভ্যস্ত। চিকিৎসকের বিনা প্রেসক্রিপশনে কাশির সিরাপ বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও এই নেশাড়ুদের কাছে অবশ্য তা সহজেই পৌঁছে যায়। পুলিশের মতে, মদের আসরের মতো সাজিয়ে বসার ঝক্কি নেই। প্রয়োজন নেই অনুষঙ্গের (চাটের)। এমনকী পুলিশের ঝামেলার আশঙ্কাও নেই। খালি ছিপি খুলে মুখে ঢেলে দিলেই মিলবে কয়েক ঘণ্টার মৌতাত। আর সেটাই নেশার জিনিস হিসাবে কাশির সিরাপের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। উত্তরপাড়া, কোন্নগর, শ্রীরামপুর, বৈদ্যবাটির বিভিন্ন গঙ্গার ঘাটে ঘুরলেই চোখেো পড়বে আনাচে কানাচে নেশার আঁতুর ঘর। রাত যত বাড়ে, তত বাড়ে ভিড় আর ততই চড়ে নেশা।
কাশির সিরাপের পাশাপাশি সিগারেটের একঘেয়েমি কাটাতে গাঁজা এখন নেশাড়ুদের কাছে বেশি প্রিয়। বিশেষত নবীন প্রজন্মের কাছে। সিগারেটের মশলা ফেলে তাতে গাঁজা পুরে দিনে-দুপুরেই সুখটানে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা। শ্রীরামপুর স্টেশন লাগোয়া এলাকায় অনায়াসেই ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় মেলে গাঁজার পুরিয়া। নেশাড়ুর হাত খুঁজে নিতে ভুল করে না বিক্রেতাকে। শেওড়াফুলি, বৈদ্যবাটি বা বড়াতেও রমরম করে চলে গাঁজার ব্যবসা।
জেলার বহু কলেজেই সোস্যালের দিন নেশার উপকরণের জোগান অবাক করেছে পুলিশকেও। বিভিন্ন সময়ে কলেজে ‘ডিউটি’ করতে আসা পুলিশকর্মীরা ছাত্রছাত্রীদের নেশার বহর দেখে রীতিমত বিস্মিত। কিছু দিন আগে জেলার একটি কলেজের একাধিক পড়ুয়াকে গঙ্গার ঘাটে প্রকাশ্যে মদ্যপানের অভিযোগে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
শহরবাসীর ক্ষোভ, ইদানীং চোলাইয়ের রমরমাও বেড়েছে। শ্রীরামপুর, শেওড়াফুলি বা বৈদ্যবাটি রেল স্টেশনের আশপাশে সন্ধ্যে থেকে রাত পর্যন্ত রমরমিয়ে চলে চোলাই-গাঁজার ঠেক। শ্রীরামপুর স্টেশনে ঢোকার আগে পশ্চিমপাড়ে, ব্রিজের নীচে, ওয়ালশ হাসপাতাল লাগোয়া জায়গায়, বন্ধ বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলের আশপাশে, রিষড়ার ৪ নম্বর গেট-সহ একাধিক জায়গায় রমরমিয়ে চলে নেশার ঠেক।
চোলাইয়ের ভাটিগুলির বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নেয় না কেন?
সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশের সঙ্গে ‘সমঝোতা’তেই ওই সব কারবার চলে। চলে নিয়মিত ‘তোলা’ আদায় মদের ঠেক বা জুয়ার বোর্ড থেকে। যার ভাগ পৌঁছে যায় আইনরক্ষকদের নিচুতলা ছেতে উপরতলা পর্যন্ত। ফলে নিশ্চিন্তে ব্যবসা চালায় চোলাই কারবারি। ঠেকের সংখ্যা কমার বদলে বাড়তে থাকে। জেলা পুলিশের এক অফিসার অবশ্য বলেন, ‘‘সর্বত্রই গাঁজার ঠেক, চোলাইয়ের ঠেকে নিয়মিত হানা দেওয়া হয়। আবগারি দফতরও অভিযান চালায়।’’