জরির কাজ করছেন শিল্পীরা। — সুব্রত জানা।
চার বছর আগে হয়েছিল উদ্বোধন। এত দিনে সাঁকরাইলের জরি হাবটি চালু হল।
মহাজনী প্রথার থেকে রেহাই পেতে হাওড়ার জরি-শিল্পীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, একটি ব্যবসা কেন্দ্রের। যেখান থেকে তাঁরা সরাসরি সরাসরি দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য বিক্রি করবেন। সেই দাবি মেনে বছর চারেক আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাঁকরাইল শিল্পতালুকে উদ্বোধন করেছিলেন জরি হাব। কিন্তু কোন পদ্ধতিতে তা চালানো হবে, সে বিষয়ে প্রশাসন সিদ্ধান্তে আসতে না পারায় হাব চালু হয়নি। সম্প্রতি সেই স্থবিরতা কাটল। জরি হাবটি চালু হওয়ায় আশায় জরি-শিল্পীরা।
ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতরের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, আপাতত একটি সমবায় সমিতিকে হাবে বসতে দেওয়া হয়েছে। আরও সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকেও দেশের বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। যাতে তাঁরা হাবের শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনেন। ধীরে ধীরে হাবটিকে ‘জরি মল’ হিসাবে গড়ে তোলা হবে। বাড়ানো হবে আরও সুযোগ-সুবিধা।
যে সমবায় সমিতি জরি-শিল্পীদের নিয়ে এখানে বসে কাজ করছে তার অধিকর্তা শেখ লালবাবু বলেন, ‘‘আমরা বেঙ্গালুরু, মুম্বই প্রভৃতি এলাকার বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছি। তাঁদের কাছ থেকে বরাত নিয়ে সরাসরি কাজ করছি। এর মধ্যে কোনও মহাজন নেই।’’
রাজ্যের ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতরই জরি হাবের দায়িত্বে রয়েছে। তারা জানিয়েছে, এখানে শিল্পীরা বসে জরির কাজ করবেন। কলকাতার বড় ব্যবসায়ী সংস্থা এখানে শো-রুম করবেন। সেখানে থাকবে জেলার জরি-শিল্পীদের পণ্যসম্ভার। দেশ-বিদেশের বড় ব্যবসায়ীরাও এখানে এসে যাতে শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি জরির পণ্য কেনেন, সে জন্য নিয়মিত ‘ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠক’ (বায়ার-সেলার মিট)-এর আয়োজন করা হবে। প্রাথমিক ভাবে ঠিক হয়েছে জরি-শিল্পীদের নিয়ে তৈরি সমবায়গুলিকেই এখানে বসতে দেওয়া হবে। সমবায়ের হাত ধরেই বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে সরাসরি তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন শিল্পীরা। হাব চালু করার প্রাথমিক প্রক্রিয়া হিসাবে গঠিত হয়েছে ‘সাঁকরাইল জরিশিল্প সমবায় সমিতি’।
হাওড়ার পাঁচলা, সাঁকরাইল, উলুবেড়িয়া, বাগনান প্রভৃতি এলাকার বহু মানুষ জরির কাজের উপরে নির্ভরশীল। কিন্তু ব্যবসাটি বহুলাংশে মহাজনী প্রথার উপরে নির্ভরশীল। কলকাতার বড় ব্যবসায়ীরাই ‘মহাজন’ হিসাবে পরিচিত। তাঁরাই শিল্পীদের বরাত দেন। সেই সঙ্গে কাপড় এবং আনুষঙ্গিক উপকরণও (দাদন) দেন। শিল্পীদের অভিযোগ, একটি কাজ করার পরে তার যা দাম হয়, তা থেকে কাপড় ও আনুষঙ্গিক উপকরণের দাম বাদ দিয়ে বাকি টাকা তাঁদের দেন ব্যবসায়ীরা। মূল্য নির্ধারণে শিল্পীর কোনও স্বাধীনতা থাকে না। অথচ, কলকাতায় চড়া দামে কাজটি বিক্রি হয়। শুধু তাই নয়, কাজে সামান্য খুঁত থাকলেও মহাজনেরা নেন না। ফলে, তাঁদের ক্ষতি হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে শিল্পীদের। এই সঙ্কট থেকে মুক্তির জন্যই জরি-শিল্পীদের দাবি ছিল ব্যবসা-কেন্দ্রের।
চার বছর আগে তিন তলা হাবটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এখানে শিল্পীদের নিজস্ব স্টল থাকবে। থাকবে কারখানা গড়ার জায়গাও। সেই সময়ে হাবটির মালিক ছিল পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম। এই সংস্থার সঙ্গে জরিশিল্পীদের সম্পর্ক কী হবে, তা নিয়ে সরকার কোনও নীতি ঠিক করতে পারেনি। এর ফলেই হাবটি চালু করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়, জরি শিল্পীদের নিয়ে তৈরি হবে সমবায়। সমবায়কেই স্টল দেওয়া হবে। তারা শিল্পীদের হাবে বসিয়ে কাজ করাতে পারে। ঠিক হয়েছে ভবনটির মালিকানা রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগমের হাতে থাকবে না। এটি দিয়ে দেওয়া হবে ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতরকে। এই দফতরই স্টল বিলি করবে। ভবনটির মালিকানা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতর সূত্রের খবর।
হাবটি চালু হওয়ায় জরি-শিল্পীরা মনে করছেন, এ বার তাঁদের পণ্য বিক্রি সহজ হবে। মুনাফাও আগের চেয়ে বাড়বে। ‘সারা ভারত জরি-শিল্পী কল্যাণ সমিতি’র সম্পাদক মুজিবর রহমান মল্লিক বলেন, ‘‘দেরিতে হলেও হাবটি চালু হল, এটা মন্দের ভাল। আশা করি, ভবিষ্যতে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে কর্মসূচি ঠিক করা হবে।’’