ছাদনাতলা মুখরিত উলুধ্বনিতে। লাজুক মুখ করে প্রায় নিরুচ্চারিত স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন বর। পাশে লাল বেনারসীতে অধোবদন ষোড়শী। এক দিকে পাত পড়েছে নিমন্ত্রিতদের। কব্জি ডুবিয়ে চলছে খানাপিনা। অতিথি-অভ্যাগতদের তালিকায় পাড়ার ‘মোড়ল-মুরুব্বি’রাও হাজির।
এমন সময়েই ‘ছন্দপতন’। বিনা নিমন্ত্রণে বিয়েবাড়িতে হাজির খাকি পোশাকের কিছু ‘উটকো’ লোক। বইয়ের পাতায় মোড়া আইন-টাইনের কথা বলে বিয়ে বন্ধ করার ফরমান দেন তাঁরা। তা রোখার চেষ্টা করেও লাভ হয় না। খাকি পোশাকের চাপাচাপিতে বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠে পড়তে হয় মেয়েটিকে।
মাস কয়েক আগের এক সন্ধ্যায় বৈদ্যবাটি পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শেওড়াফুলি চ্যাটার্জিপাড়ার একটি বাড়িতে নাবালিকার বিয়ের খবর পেয়ে পড়িমড়ি ছুটেছিল পুলিশ। তার পরের দৃশ্য এমনই।
আপাতদৃষ্টিতে প্রশাসনিক তৎপরতায় নাবালিকার বিয়ে বন্ধের একটি নজির এটি। কিন্তু হুগলি জেলার নানা প্রান্তে এমন ঘটনা আকছার ঘটছে। কলকাতার কাছের এই জেলায় নাবালিকা-বিয়ের প্রবণতা দেখে চিন্তার ভাঁজ প্রশাসনিক আধিকারিকদের কপালে। গ্রামগঞ্জ তো বটেই, শহরাঞ্চলেও আকছার ঘটছে এমন ঘটনা।
রাজ্য সরকারের ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের সুফল হিসেবে নাবালিকা বিয়ের প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে বলেই ভেবেছিল প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে তা না হওয়ায় প্রশাসনিক আধিকারিকরা চিন্তিত। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও এ নিয়ে দৌড়-ঝাঁপ করছেন। তাঁদের একাংশও হতাশ।
কম বয়সে মেয়ের বিয়ে ঠিক করার বিভিন্ন ঘটনা ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, এর অন্যতম কারণ দারিদ্র। শেওড়াফুলির মেয়েটির বাবা একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সমাজ দার্শনিকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে মেয়েকে ‘পার’ করাই অনেক অভিভাবকের কাছে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই কারণেই মেয়ের তেরো-চোদ্দো বছর পেরোতে না পেরোতেই বিয়ের চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে যায়। ‘সুপাত্র’ পেলে মেয়েকে তাঁর হাতে সঁপে দিতে বিশেষ ভাবতে হয় না।
চাইল্ড লাইনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে জুন মাস পর্যন্ত ত্রিশটিরও বেশি নাবালিকা-বিয়ে আটকানো হয়েছে হুগলি জেলায়। শ্রীরামপুর-উত্তরপাড়া ব্লকের কানাইপুর, চণ্ডীতলা, তারকেশ্বর, আরামবাগের মতো এলাকা থেকে প্রায়ই নাবালিকার বিয়ের আয়োজনের খবর মিলছে। গত অগস্ট মাসে আদিসপ্তগ্রামের একটি বিদ্যালয়ের দু’জন নবম শ্রেণির পড়ুয়া এবং একজন দশম শ্রেণির পড়ুয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। প্রশাসনের তৎপরতায় সেগুলি বন্ধ হয়। কিছু দিন আগে শ্রীরামপুরের নওগাঁ এলাকার একটি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের হস্তক্ষেপে পুলিশ গিয়ে একটি মেয়ের বিয়ে বন্ধ করে। প্রশাসন সূত্রের খবর, অনেক ক্ষেত্রেই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা নাবালিকা-বিয়ের খবর পেলে প্রশাসনকে জানাচ্ছেন। সম্প্রতি দুই স্কুলছাত্রী নিজেরাই চাইল্ড লাইনে ফোন করে জানায়, তাদের বিয়ে ঠিক করা হচ্ছে। কিন্তু তারা তা চায় না। তারা পড়তে চায়।
হরিপালের একটি স্কুলের কর্তৃপক্ষ নাবালিকা বিয়ের কুফল নিয়ে রীতিমতো প্রচার শুরু করেন। গত বছর ক্লাসে পড়ানোর সময় মেয়েদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে অভিভাবকদের কাছে লিফলেট পাঠানো হয়। ফ্লেক্স লাগানো হয়। তাতে যথেষ্ট সাড়াও মেলে। কিন্তু বছর ঘুরতেই ছবিটা কিছুটা ফিকে। কয়েক মাস আগে সাইকেল বিলির সময় স্কুলের নজরে আসে, পাঁচ ছাত্রী আসছে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের মধ্যে তিনটি মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
অন্য দু’জনের দেখাশোনা চলছিল। ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকেরা গিয়ে তা বন্ধ করেন। এক শিক্ষকের বক্তব্য, ‘‘এখন খুব লুকিয়ে-চুরিয়ে ভাবে বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে। পাড়া পড়শিরাও কেমন যেন মুখ বুজে থাকছেন। স্কুলে যেন খবর না পৌঁছয়, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। আমাদের উপর নানা ভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে।’’
তবে নাবালিকা বিয়ের কথা কানে এলেই প্রশাসনের আধিকারিকেরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে একে বারে শেষ মূহূর্তে তাঁদের কানে খবর আসছে। অনেক সময় আবার খবর পৌঁছচ্ছে না।
ঠিক কী পদক্ষেপ করলে, নাবালিকা বিয়ে পুরোপুরি বন্ধ হবে, সেটাই এখন মাথাব্যাথা প্রশাসনের।
চাইল্ড লাইনের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘নাবালিকাদের বিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করতে সচেতনাই একমাত্র রাস্তা। সেই চেষ্টাই করা হচ্ছে।’’