ভাড়াটের তথ্য পেতে তৎপর হচ্ছে পুলিশ

পুলিশ জানতে চায়। শহর ও শহরবাসীর নিরাপত্তার কারণে। কোন বাড়িতে কে ভাড়ায় আছেন? কোথা থেকে সেই ভাড়াটের আগমন? তিনি এখন কী করেন বা আগে কী করতেন?

Advertisement

দেবাশিস দাস

শেষ আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ২১:৪৪
Share:

পুলিশ জানতে চায়। শহর ও শহরবাসীর নিরাপত্তার কারণে।

Advertisement

কোন বাড়িতে কে ভাড়ায় আছেন? কোথা থেকে সেই ভাড়াটের আগমন? তিনি এখন কী করেন বা আগে কী করতেন?

পুলিশ কিন্তু জানতে পারে না। শহরবাসীদের অনেকেই তথ্য দেন না।

Advertisement

অথচ এই সব তথ্য জানার ব্যবস্থা কলকাতা পু‌লিশ চালু করেছে সাত বছর আগেই, ২০০৮-এ। যার নাম ‘রেসিডেনশিয়াল টেন্যান্টস প্রোফাইল ফর্ম’। ছবি-সহ ফর্ম পূরণ কিন্তু কেউ জানালে তবে তো পুলিশ জানবে! অধিকাংশ মানুষ জানাতেই চান না।

এই অবস্থায় ভাড়াটেদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেতে এই ব্যবস্থাকে সফল ভাবে কার্যকর করতে চাইছে লালবাজার। শনিবার যুগ্ম কমিশনার (সদর) রাজীব মিশ্র বলেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে আমরা নতুন ভাবে চিন্তাভাবনা শুরু করেছি। চালু ব্যবস্থা যাতে কার্যকর করা যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’’

আসলে বিপদ বড় বালাই।

খাস পাকিস্তান থেকে উজিয়ে এসে বছর দুয়েক মেটিয়াবুরুজে ছিল পাকিস্তানের নাগরিক ও সন্দেহভাজন আইএসআই চর ইজাজ। এখানে ভারতীয় রেশন কার্ড, আধার কার্ড, পাসপোর্ট-ও জোগাড় করে নিয়েছিল। কলকাতা পুলিশ জানতেই পারেনি। গত ২৭ নভেম্বর উত্তরপ্রদেশ পুলিশ যখন মেরঠ থেকে ওই যুবককে গ্রেফতার করল, তত দিনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বহু গোপন নথি ও তথ্য সে পাকিস্তানে পাচার করে ফেলেছে।

আবার, ২০০৭-এর মে মাসে যাদবপুরের বাপুজিনগরের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া উঠেছিল মণিপুরের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন পিপলস রেভোলিউশনারি পার্টি অব কাংলেইপাক বা প্রিপাক-এর সদস্য। শেষমেশ সাত মাস পরে, সে বছর ডিসেম্বরে পুলিশ ওই ফ্ল্যাটে হানা দিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।

বিশেষত গার্ডেনরিচের চর-কাণ্ডের পর ভাড়াটেদের ব্যাপারে তথ্য জানতে তৎপর হয়েছে কলকাতা পুলিশ। তাদের বক্তব্য, সমস্ত ভাড়াটের নথি হাতে থাকলে অনেক সুবিধে হবে, কিছুটা হলেও ঝুঁকি কমবে। কিন্তু বাড়ির মালিক জানাতে না চাইলে তাঁকে জোর করার বা তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও ক্ষমতা পুলিশের নেই। কারণ, এটা কোনও আইন নয়— একটি প্রশাসনিক নির্দেশ মাত্র। তা হলে কী ভাবে ভাড়াটেদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে?

লালবাজার সূত্রের খবর, আপাতত এই ব্যাপারে জোরকদমে প্রচার চালানো হবে। বিভিন্ন বিপদ সম্পর্কে বাড়িওয়ালাদের সচেতন করে তাঁদের কাছ থেকে ভাড়াটেদের সম্পর্কে তথ্য চাইবে পুলিশ। একাধিক কর্তা স্বীকার করে নিচ্ছেন, পরিচারক, পরিচারিকাদের তথ্য দেওয়ার ব্যাপারে যে ভাবে প্রচার করা হয়েছে কিংবা ‘প্রণাম’ প্রকল্পের আওতায় প্রবীণ নাগরিকদের তথ্য পেতে যে তৎপরতা রয়েছে, ভাড়াটেদের ব্যাপারে তথ্য পেতে তেমন কোমর বেঁধে নামা কখনও হয়নি।

অথচ প্রাক্তন সিবিআই কর্তা, বর্তমানে রাজ্যের মন্ত্রী উপেন বিশ্বাসের সল্টলেকের বাড়িতে এক যুগ আগে ভাড়াটে হিসেবে এসে উঠেছিল এক আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী। তার পরেও কিন্তু কলকাতা পুলিশ শিক্ষা নেয়নি। সচেতনতা নেই বহু নাগরিকেরও। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্তার কথায়, ‘‘আমি নিজে শহরের বেশ কয়েকটি বহুতলের বাসিন্দাদের সঙ্গে এই ব্যাপারে বৈঠক করেছি। কিন্তু তেমন সাড়া মেলেনি।’’

অথচ ‘রেসিডেনশিয়াল টেন্যান্টস প্রোফাইল ফর্ম’ কলকাতার সব ক’টি থানায় চাইলেই বিনামূল্যে দেওয়া হয় বলে জানাচ্ছে লালবাজার। কলকাতা পুলিশের ওয়েবসাইটে গিয়েও ওই ফর্ম ডাউনলোড করা যাবে। নিয়ম অনুযায়ী, নতুন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পরেই ওই ফর্ম পূরণ করে থানায় জমা দেওয়ার কথা। তবে চুক্তি হওয়ার কত দিনের মধ্যে ফর্ম জমা করতে হবে, তার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা পুলিশ ঠিক করে দেয়নি। তবে এ বার সেই সময়সীমাও ঠিক করে দিয়ে পুলিশ ভাড়াটেদের সম্পর্কে তথ্য পেতে প্রচার চালাবে।

কিন্তু বাসিন্দাদের মধ্যে এই ব্যাপারে উদ্যোগের অভাব কেন?

কলকাতার কয়েকটি থানার ওসি-দের অভিমত এ ক্ষেত্রে এক। তাঁরা জানাচ্ছেন, আইনি জটিলতা এবং আয়কর সংক্রান্ত গণ্ডগোল এড়াতে চেয়ে ভাড়াটেদের সম্পর্কে তথ্য না দেওয়ার ঝোঁক দেখা যায় বহু ক্ষেত্রে।

লালবাজারের যুগ্ম কমিশনার (অপরাধ দমন) পল্লবকান্তি ঘোষও মেনে নিচ্ছেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে এখনও শহরবাসীর মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে।’’ তা হলে উপায়?

লালবাজারের কর্তারা জানাচ্ছেন, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ‘প্রণাম’-এর মতো যে সব প্রকল্প চালু ও যাতে সাড়া মিলেছে, সেগুলোর সঙ্গে ভাড়াটেদের এই বিষয়টিকে যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে।

তবে ভাবনার স্তরে থাকতে থাকতেই না আবার ইজাজের মতো কোনও বিদেশি গুপ্তচর কিংবা কোনও জঙ্গির কার্যকলাপের কথা বেরিয়ে পড়ে, এটাই ভয় গোয়েন্দাদের একাংশের।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement