চন্দননগর হাসপাতাল থেকে বাড়ির পথে গোলাপ।-নিজস্ব চিত্র।
বাড়িতে রয়েছে দাদা-বৌদি আর মা। ছেলে চাকরির খোঁজে যাচ্ছে বলতে আশীর্বাদ করেছিলেন যেন সফল হয়। কিন্তু চাকরি খুঁজতে গিয়ে ছেলে হারিয়ে যাবে ভাবতে পারেননি। তাই ছেলের বাড়ি থেকে বেরোনোর দিন কয়েক পর থেকেই যখন আর খোঁজ মিলছিল না, মা রিজিয়া গোড়ের মন তখন থেকেই কেঁদে উঠেছিল। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে তাকিয়ে থাকতেন। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ত জল।
সোমবার ভাই গোলাপকে ফিরে পেয়ে একই সঙ্গে খুশি আর দুঃখে ভেজা চোখে কথাগুলো বলছিলেন দাদা মিন্টু গোড়। এ দিন ভাইকে চন্দননগর হাসপাতালে দেখে তাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে যখন আত্মহারা, তখনই নজর পড়ে ভাইয়ের পায়ের দিকে। ডাক্তারের কাছে যখন শুনলেন, দুর্ঘটনার কারণে ভাইয়ের একটা পা বাদ দিতে হয়েছে তখন কেঁদে ফেলেন। জানালেন, ‘‘ডিসেম্বরের ১৭ তারিখে ভাই তার বন্ধু দিনেশ পাউলের সঙ্গে চাকরি খুঁজতে ম্যাঙ্গালোর যাবে বলে বাড়ি থেকে রওনা হয়। ২০ তারিখ ভাই জানায় তারা চাকরি পায়নি। তাই বাড়ি ফিরে আসছে। তারপর থেকে আর যোগাযোগ ছিল না।’’
কিন্তু দিন তিনেক পরেও না ফেরায় চিন্তায় পড়ে যায় গোড় পরিবার। মিণ্টুবাবু বলেন, ‘‘কী করব, কোথায় ভাইকে খুঁজব যখন ভেবে পাচ্ছি না, তখনই ২৪ জানুয়ারি হঠাৎ স্থানীয় মাজবাড থানা থেকে আমাদের বাড়িতে পুলিশ আসে একটি কাগজ নিয়ে। তাতে ভাইয়ের ছবি ছিল। ছবি দেখে আমরা চিনতে পারি। এরপর সেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের রেল পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ভাই কোথায় আছে জানতে পারি। এক বন্ধুকে সঙ্গে করে অসম থেকে হুগলিতে এই হাসপাতালে আসি। এখানকার পুলিশের জন্যই ভাইকে ফিরে পেলাম। তবে একটা পা চলে গিয়েছে ভেবে কষ্ট হচ্ছে। ভাইয়ের জন্য মা সারাদিন কান্নাকাটি করত। খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল। ভাইকে ফিরে না পেলে হয়তো মাকে বাঁচাতে পারতাম না।’’
প্রথমে কিছু বলতে না পারলেও এ দিন দাদাকে দেখে চিনতে ভুল করেননি গোলাপ। বছর চব্বিশের গোলাপ দাদার সামনেই বলেন, ‘‘২০ ডিসেম্বর ম্যাঙ্গালোর- গৌহাটি ভায়া হাওড়ার ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরছিলাম। ২২শে ডিসেম্বর হাওড়া স্টেশনে নেমে শৌচাগারে গেলে ট্রেন ছেড়ে দেয়। কোনও উপায় না দেখে দিশাহারা হয়ে অন্য একটি ট্রেনে উঠে পড়ি। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার পর জানতে পারি এই ট্রেন অসমে যাবে না। ততক্ষণে ট্রেন অনেক দূর চলে এসেছে। এর পর যখন একটা স্টেশনে ট্রেন ঢুকছিল সেই সময় চলন্ত ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে পড়ে যাই। তারপর আর কিছু মনে নেই।’’
রেল পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই দিন রাতেই হাওড়া-বর্ধমান মেন শাখার মানকুন্ডু ও চন্দননগর স্টেশনের মাঝে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় দুই রেল পুলিশকর্মী গোলাপকে উদ্ধার করেন। তাঁরাই তাঁকে চন্দননগর হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালের চিকিৎসক রাকেশ খান এ দিন বলেন, ‘‘যে অবস্থায় ছেলেটা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, তাতে প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো মারা যাবে। ওকে বাঁচিয়ে তোলার একটা জেদ চেপে গিয়েছিল। চেষ্টা করেছিলাম ওকে সুস্থ করে তোলার। বাধ্য হয়েই ওর একটা পা বাদ দিতে হয়েছে। কোথা থেকে কী ভাবে এসেছে কিছুই বলতে পারছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত যে ওর পরিবারের কাছে ফিরতে পারছে সে জন্য রেল পুলিশকে ধন্যবাদ।’’
রেল পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘আনন্দবাজার পত্রিকায় ছেলেটির সম্পর্কে খবর ও ছবি প্রকাশের পর আমরা অসম পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে গোলাপের সঠিক ঠিকানা এবং আসল পরিচয় সংগ্রহ করি। শেষ পর্যন্ত ওকে বাড়ি ফেরাতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। ধন্যবাদ অসম পুলিশকেও।’’
এ দিন দাদার সঙ্গে বাড়ি ফেরার আনন্দে আধো হিন্দি আধো অসমিয়ায় গোলাপ বলে, ‘‘এ বার বাড়ি ফিরে যাব। খুব ভাল লাগছে। মাকে দেখতে পাব। তবে আপনাদের ও ডাক্তারবাবুকে ছেড়ে যেতেও খারাপ লাগছে। ডাক্তারবাবু না থাকলে আমি বাঁচতাম না। একটা দুঃখ, বাড়ি থেকে দুই পা নিয়ে বেরিয়েছিলাম। ফিরতে হচ্ছে এক পা নিয়ে।’’ ভাইকে গাড়িতে তোলার সময় দাদার মুখেও শোনা গেল, ‘‘একটা পা নেই, কিন্তু ভাইকে তো ফিরে পেলাম। আপনাদের ধন্যবাদ।’’