চাষিদের থেকে ধান কিনে লক্ষ্মীলাভ

চাষিদের না ঠকিয়েও লাভ করা যায়, তা দেখিয়ে দিল শ্যামপুরের মেয়েরা। তাদের সমবায় সমিতি সরকার-নির্ধারিত সহায়ক মূল্য দিয়ে সরাসরি ধান কিনছে চাষিদের থেকে। গত ১০ মাসে সমিতি লাভ করেছে ৭ লক্ষ টাকা।

Advertisement

নুরুল আবসার

শেষ আপডেট: ২২ অগস্ট ২০১৫ ০১:২৭
Share:

ধান কিনছেন মহিলা সমবায় সমিতির সদস্যরা। ছবি: সুব্রত জানা।

চাষিদের না ঠকিয়েও লাভ করা যায়, তা দেখিয়ে দিল শ্যামপুরের মেয়েরা। তাদের সমবায় সমিতি সরকার-নির্ধারিত সহায়ক মূল্য দিয়ে সরাসরি ধান কিনছে চাষিদের থেকে। গত ১০ মাসে সমিতি লাভ করেছে ৭ লক্ষ টাকা।

Advertisement

মেয়েদের এই উদ্যোগ নজর কেড়েছে নাবার্ডেরও। নাবার্ডের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার অমিতকুমার দাস বলেন, ‘‘ধান কেনার কাজে ওই মহিলারা রীতিমতো সাফল্য পেয়েছেন। ভবিষ্যতে যদি গুদাম তৈরির মতো কোনও কাজের জন্য ওঁরা নাবার্ডের সহায়তা চান, আমরা অবশ্যই বিবেচনা করে দেখব।’’

ছোট চাষিরা যাতে ফড়েদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য না হন, তার জন্য সরকার প্রতি বছরই সরাসরি চাষিদের থেতে ধান কেনার কর্মসূচি চালু রাখে। সরকার-নির্ধারিত ন্যূনতম মূল্য দিয়ে চাষিদের থেকে ধান কেনার কথা বেনফেড, কনফেড, চালকল মালিক-সহ নানা প্রতিষ্ঠানের। কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, ফড়েরাই চাষিদের থেকে কম দামে চাল সংগ্রহ করে, তাদের ভোটার কার্ড ব্যবহার করে, চালকল মালিকদের সরবরাহ করে। সরকারি শিবিরেও আসে ফড়েরা। তাই সরকারি মূল্য পাচ্ছে এই মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরাই। এই যেখানে পরিস্থিতি, সেখানে নিয়ম মেনে ধান কিনে ব্যতিক্রম মহিলামঙ্গল সমবায় ঋণদান সমিতি।

Advertisement

ভাদ্রের গোড়ায় একদিন হাওড়ার রাধাপুর পঞ্চায়েতের অধীন পুরুলপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, নিজের হাতে দাঁড়িপাল্লায় ধান ওজন করে বস্তায় ঢেলে দিচ্ছেন বৃদ্ধ রামপদ মাজি। বস্তার মুখ খুলে তা ভরে নিলেন কৃষ্ণা মন্ত্রী। কৃষ্ণাদেবী মহিলামঙ্গল সমবায় ঋণদান সমিতির অন্যতম কর্তা। এই সমিতি রাজ্য অত্যাবশকীয় পণ্য সরবরাহ নিগমের অনুমতি নিয়ে রাধাপুর পঞ্চায়েতের বিভিন্ন এলাকায় ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ধান কিনছে তিন বছর ধরে।

এই মরসুমে ধান কেনা শুরু হয়েছে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে। এখনও পর্যন্ত ২০০০ মেট্রিক টন ধান কিনেছে সমিতি। সমিতির অফিসে বসে সদস্যদের নিয়মিত ঋণদান, আর গ্রামে গ্রামে চাষিদের কাছ থেকে ধান কেনা, দু’টিই সমান তালে চালাচ্ছেন মহিলারা।

Advertisement

মহিলা সমিতির কাছে ধান বিক্রি করে খুশি চাষিরাও। পুরুলপাড়ার রামপদ মাজি, হিমাংশু আদকেরা বললেন, ‘‘মহিলারা যত্ন করে কাজটা করেন। ফের শিবির হলে আমরা বাকি যে ধান ঘরে আছে তা বিক্রি করে দেব।’’ অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা ও বস্তা নিয়ে শিবির খোলার জন্য মুখিয়ে আছেন মানসী বৈতালিক, অচিত্রা আদক, শ্রুতিকণা বৈতালিকেরা।

সঞ্চয় ও ঋণদানেই অধিকাংশ মহিলা সমবায় সমিতি সীমাবদ্ধ থাকে। কেন ধান কেনায় উৎসাহী হল হাওড়ার এই মহিলা সমবায়? কৃষ্ণাদেবী জানালেন, ধান কিনে চালকল মালিকদের হাতে তুলে দিলে নিগমের কাছ থেকে কুইন্টাল প্রতি সাত টাকা করে কমিশন মেলে। এটাই তাদের লাভ। তিলে তিলে তালের মতো, কুইন্টাল-প্রতি সাত টাকা কমিশন থেকেই এ বছর ৭ লক্ষ টাকা পেয়েছে সমিতি। সেই সঙ্গে, মাঠে নেমে চাষিদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে পারার অভিজ্ঞতাও তাঁদের বড় পুঁজি।

রাধাপুরে ঋণদান সমিতির সূত্রপাত হয় বাংলা কৃষক সমিতি নামে ফারমার্স ক্লাব গঠনের মধ্যে দিয়ে। মাশরুম চাষ, জৈব সার উৎপাদন প্রভৃতি কাজ করত এই ক্লাব। তাতে মহিলা এবং পুরুষ উভয় সদস্যই ছিলেন। ২০০৭ সালে তৈরি হয় মহিলামঙ্গল সমবায় ঋণদান সমিতি। তারা অন্যান্য প্রাথমিক কৃষি সমবায় ঋণদান সমিতির মতো ব্যাঙ্ক পরিষেবাও চালু করে। এই কাজে তাদের অনুমতি দেয় সমবায় দফতর।

২০১০ সাল থেকে সমিতি ধান কেনার উদ্যোগ নেয়। সমিতির সভাপতি শ্রুতিকণা চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আমাদের উদ্যোগকে প্রথমে অনেকে সহজভাবে নেননি। সমবায় দফতর বা নিগম অনুমতি দিতে টালবাহানা করে।’’ নাবার্ড অবশ্য প্রথম থেকেই উৎসাহ দেয়। মহিলাদের জেদের কাছে হার মেনে ২০১২-১৩ অর্থবর্ষ থেকে ধান কেনার অনুমতি পায় সমিতি। বিভিন্ন গ্রামে শিবির খোলার জন্য কর্মসূচি পায় তারা। সেইমতো চাষিদের মধ্যে প্রচার করা থেকে শুরু করে, শিবির খোলা, ধান কেনা, চাষিদের টাকা দেওয়া, চালকলের লরি এলে নিজেদের তত্বাবধানে ধান তুলে দেওয়া সব কাজ দাঁড়িয়ে থেকে করেছেন সমিতির সদস্যরা।

মহিলারা কতটা সফল হবেন তা নিয়ে তাঁদের সংশয় যে ছিল, সেকথা স্বীকার করেছে নিগম। জেলায় মহিলারা ধান কিনছেন এমন খুব বেশি নজির নেই। নিগমের এক কর্তার বক্তব্য, ‘‘মহিলা সমিতিকে দিয়ে ধান কেনার পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে সবাই নিগমকেই দূষতেন।’’ এখন অবশ্য উচ্ছসিত নিগমের কর্তারা। মহিলাদের কাজের প্রশংসা করেছে জেলা সমবায় দফতর এবং নাবার্ড। সমবায় দফতরের এক পদস্থ আধিকারিক জানান, প্রাথমিক কৃষি ঋণদান সমিতিগুলি মতোই, তহবিল বাড়ানোর জন্য মহিলামঙ্গল সমিতিও চাষিদের থেকে সরাসরি ধান কিনছে। এটা ভাল নজির।

এই মরসুমে ধান কেনা এখনও শেষ হয়নি। চলবে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। জেলা খাদ্য ও সরবরাহ দফতর সূত্রের খবর, বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যাওয়ায় ধানের ফলন খেতে পারে এই আশঙ্কায় চাষিরা তাঁদের ঘরে যে ধান আছে তা নিজেদের খাওয়ার জন্য মজুত করে রেখেছেন। এই পরিস্থিতি কেটে গেলে ফের বকেয়া শিবির চালু করা হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement