পছন্দের পাঞ্জাবি কিনতে দোকানে ক্রেতা। ছবি: সুব্রত জানা।
যেন ছোট্ট এক টুকরো চিৎপুর!
অঙ্কুরহাটি চেকপোস্ট ছাড়িয়ে কোনা এক্সপ্রেসওয়ের দিকে যেতে মুম্বই রোডের ধারে সার সার অস্থায়ী স্টল। সবই পাঞ্জাবির। কোনওটার দাম ২৫০ টাকা, কোনওটা ৫০০, কোনওটা হাজার টাকারও বেশি। সব স্টলেই ক্রেতার ভিড়। দম ফেলার ফুরসত নেই বিক্রেতাদের।
হাওড়ার ডোমজুড়ের নিবড়া পাঞ্জাবির জন্য বিখ্যাত। এই গ্রামে ঘরে ঘরে সারা বছর তৈরি হয় পাঞ্জাবি। প্রতি বছরের মতো এ বারও ইদের কয়েক দিন আগে থেকে মুম্বই রোডের ধারে কারিগরেরা স্টলে তাঁদের নিজেদের তৈরি পাঞ্জাবি নিয়ে বসে গিয়েছেন। হরেক কিসিমের পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে শতাধিক স্টলে। ঠিক যেমনটি দেখা যায় কলকাতার চিৎপুরে নাখোদা মসজিদ সংলগ্ন এলাকায়। সেখানে রবীন্দ্র সরণির দু’দিকে রয়েছে শুধুমাত্র পাঞ্জাবির দোকান।
চিৎপুরের সঙ্গে নিবড়ার তফাত এই যে, চিৎপুরে বিকিকিনি চলে বছরভর। ইদের সময়ে তা বেড়ে যায় বহুগুণ। নিবড়ায় শুধুমাত্র বিকিকিনি চলে ইদের মরসুমের কয়েক দিন। সেই হিসেবে নিবড়ার বিকিকিনিকে ‘পাঞ্জাবির মেলা’ বলা চলে। ইদের দিন পনেরো আগে থেকে শুরু হয়েছে বিক্রিবাটা। কারিগরেরা অস্থায়ী স্টল তৈরি করে সেখানে এনেছেন বিভিন্ন ডিজাইনের পাঞ্জাবি। হাওড়া তো বটেই, হুগলির বিভিন্ন এলাকা থেকেও ক্রেতারা আসছেন।
নিবড়া গ্রামে ঘরে ঘরে দরজির বাস। তাঁদের বছরভর তৈরি পাঞ্জাবি কলকাতার চিৎপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির জন্য চলে যায়। কলকাতার বিভিন্ন বড় দোকান থেকেও নিবড়ায় পাঞ্জাবির বরাত আসে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্তত ১০ হাজার পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বছরভর কাজ করলেও ইদের সময়ে কিছু বাড়তি রোজগারের আশায় তাঁরা পাঞ্জাবির মেলা বসান বলে জানালেন মহম্মদ আলতাব নামে এক কারিগর। তিনি এখানে স্টল নিয়েছেন। ক্রেতার ভিড়ে নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই তাঁর। আলতাব বলেন, ‘‘আড়াইশো টাকা থেকে শুরু করে চার হাজার টাকা পর্যন্ত পাঞ্জাবি রয়েছে আমার কাছে। সব আমাদের নিজেদের তৈরি।’’
কারিগরেরা জানান, বছরভর তাঁরা যে পাঞ্জাবি তৈরি করেন, সেগুলি পাইকারি দরে বিক্রি হয়। কিন্তু মেলায় বিক্রি করেন খুচরো দরে। ফলে, এই সময়ে একটু বেশি লাভ করেন তাঁরা। ক্রেতারাও জানেন সে কথা। শুধু গুণমান বা ডিজাইন-ই নয়, চাইলে এখানে কেনার পরে ক্রেতারা পাঞ্জাবি পরে দেখে নিতে পারেন ঠিকঠাক ফিট করেছে কিনা। তা না হলে কারিগরেরা তা সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে দেন, যে সুবিধা চিৎপুরে পাওয়া যায় না।
বৃহস্পতিবার রানিহাটি থেকে এখানে পাঞ্জাবি কিনতে এসেছিলেন আরিফ জামাদার। বি কম তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আরিফ বললেন, ‘‘দাম এখানে বরং একটু বেশিই। কিন্তু হরেক ডিজাইনের পাঞ্জাবি মেলে। তাই আমরা দাম নিয়ে অতটা ভাবিনি। প্রতি বছর ইদের আগে নিজের এবং পরিবারের সকলের জন্য এখান থেকে পাঞ্জাবি কিনে নিয়ে যাই।’’
রানিহাটি থেকেই পাঞ্জাবি কিনতে এসেছিলেন পেশায় ব্যবসায়ী ফিরদৌস মল্লিকও। তিনি বলেন, ‘‘গুণমান এবং ডিজাইনের দিক থেকে এখানকার পাঞ্জাবি বেশ ভাল। ফলে, দাম কিছুটা বেশি পড়লেও এখান থেকে পাঞ্জাবি কিনলে লোকসান হয় না।’’
কাল শনিবার ইদ। এমনিতে রাত ১১টা পর্যন্ত কেনাকাটা হলেও আজ, শুক্রবার ইদের আগের দিন (যাকে ‘চাঁদ রাত’ বলে থাকেন মুসলিমরা) অনেক রাত পর্যন্ত চলবে বিকিকিনি। আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে পুরো মেলা চত্বর। বাড়তি কিছু পয়সা কারিগরদের মুখে ফোটাবে হাসি।