দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয় হতে হতে মানুষের হাড় ভেঙে গেলেও দাঁতের এনামেলের কোনও পরিবর্তন হয় না। ছবি: সংগৃহীত।
দাঁত দিয়ে যায় চেনা! দাঁতই বলে দেয়, কী খেত তার ধারক। কেমন পরিবেশে থাকত। যুগের পর যুগ বদলে গেলে, সেই ধারকের মৃত্যু হলেও সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে ফাঁকি দেয় না দাঁত। পূর্ব আফ্রিকা থেকে উদ্ধার হওয়া দাঁতের জীবাশ্ম পরখ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, লক্ষ লক্ষ বছর আগে সেখানকার প্রাণীদের খাদ্যাভাস, হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্র, আদিম মানবের পরিবর্তিত জগৎ।
দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষয় হতে হতে মানুষের হাড় ভেঙে গেলেও দাঁতের এনামেলের কোনও পরিবর্তন হয় না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পলি, শিলার নীচে চাপা পড়ে থাকলেও দাঁতে ক্ষয় ধরে না। মাটি খনন করে অপরিবর্তিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় দাঁত। প্রাণী পরিণত বয়সে পৌঁছোলে তার দাঁতের এনামেল গঠিত হয়। ওই প্রাণীর বাকি জীবন এই এনামেলের রাসায়নিক গঠন একই থেকে যায়। দাঁতের ধারক কী খাচ্ছে, কী পান করছে, তার ছাপ পড়ে এনামেলে। সে কারণে লক্ষ লক্ষ বছর পরে সেই দাঁতের জীবাশ্ম যখন উদ্ধার করেন প্রত্নতাত্ত্বিকেরা, তখন তা থেকে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার করতে সমর্থ হন তাঁরা। হারিয়ে যাওয়া বনভূমির হদিসও মেলে।
আমেরিকার ওহায়োর ডেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ়েলালেম বেদাসোর নেতৃত্ব এই গবেষণা হয়েছিল। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় ‘দ্য কনভারসেশন’ পত্রিকায়। পূর্ব আফ্রিকার ইথিয়োপিয়ার আফার অঞ্চল থেকে ওই দাঁতের জীবাশ্ম উদ্ধার করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। আর তা পরীক্ষা করে জানতে পেরেছিলেন, লক্ষ লক্ষ বছর আগে কেমন ছিল প্রাণী, আদিম মানবের জীবনযাত্রা। কেমন ছিল সে সময়ের প্রাণীদের লড়াই। বিজ্ঞানীরা ওই জীবাশ্ম থেকে সামান্য পরিমাণ এনামেল সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন।
গাছ এবং ঘাস সালোক সংশ্লেষের মাধ্যমে সূর্যালোককে শক্তিতে পরিণত করে। সেই প্রক্রিয়া কিন্তু এক এক উদ্ভিদের ক্ষেত্র এক এক রকম, যার চিহ্ন থেকে যায় তাদের কলায়। সেই উদ্ভিদ যারা খায়, সেই প্রাণীদের দাঁতে আবার তা ছাপ ফেলে যায়। এনামেল পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, সেই ধারক-প্রাণী কী ধরনের উদ্ভিদ খেয়েছিল।
এক-একটি শিলাস্তর থেকে মেলা এক একটি দাঁতের জীবাশ্ম এক এক সময়কালের কথা বলে। এক এক পরিবেশের কথা বলে। শিলাস্তরের গভীরে যে দাঁত মেলে, তার ধারকের বয়স, উপরিস্তর থেকে মেলা দাঁতের ধারকের বয়সের তুলনায় অনেক বেশি। বিভিন্ন শিলাস্তরে মেলা দাঁত জানান দিয়েছে, কী ভাবে বদলেছে প্রাণীদের যাপন, কী ভাবে বদলেছে তাদের পরিবেশ। এই তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ব আফ্রিকায় পরিবেশ, জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন ধরতে পেরেছেন তাঁরা।
বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, আজ আফার অঞ্চল যেমন শুষ্ক, ৪০ লক্ষ বছর আগে তা ছিল না। সে সময় ওই অঞ্চলে ছড়িয়েছিটিয়ে ছিল বনভূমি, হ্রদ। ওই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল নদীও। তার অববাহিকায় ছিল বিস্তীর্ণ তৃণভূমি। ওই এলাকা থেকে অ্যান্টিলোপস, জিরাফ, শূকর, ঘোড়া, হাতি, জলহস্তীর দাঁত মিলেছে। তাদের কেউ গাছের পাতা খেত, কেউ খেত ঘাস। ওই প্রাণীদের দাঁত পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, আজকের শুষ্ক আফার অঞ্চলে ছিল তৃণভূমি, জঙ্গল, নদী। সেখানেই বিচরণ করত ওই প্রাণীরা। পেত বেঁচে থাকার রসদ।
২০ থেকে ৩০ লক্ষ বছর আগে ওই আফার অঞ্চল তৃণভূমি, সাভানায় পরিণত হয়। তখন সেখানে জঙ্গল আর ছিল না। ওই অঞ্চলের নীচে থাকা ভূগর্ভস্থ তিনটি পাত একে অপরের থেকে সে সময় দূরে সরতে থাকে। তার প্রভাব পড়ে সেখানকার ভূমিরূপ, জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্রে। বিবর্তন হয় প্রাণীদের। ঘোড়া, অ্যান্টিলোপদের দাঁত হয় কঠিন, যা শুষ্ক ভূমি থেকে ঘাস ছিঁড়তে সাহায্য করত। সে কথাও জানিয়েছে তাদের দাঁতই।
২৯ থেকে ৩৮ লক্ষ বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় থাকত আদিম মানবের অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রেনসিস প্রজাতি। তাদের দাঁতের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা জেনেছেন, মূলত ফলমূল, পাতা খেয়েই জীবনধারণ করত তারা। মূল কথা, ওই অঞ্চলে যা পাওয়া যেত তখন, তা-ই খেত। তবে তারা ঘাস খুব একটা খেত না। ক্রমেই তাদের খাদ্যাভ্যাস বদলেছে, যখন আফার অঞ্চলের পরিবেশ বদলেছে। এর পরে এসেছে আধুনিক মানুষ। তা-ও ধরা পড়েছে দাঁত থেকেই।