Fear of Darkness

অন্ধকারকে কেন ভয় পায় মানুষ? উত্তর লুকিয়ে আছে পূর্বসূরিদের ফেলে আসা আদিমকালের সেই ভয়ানক রাতগুলিতেও

সূর্যাস্তের পরে আদিমানবেরা আর শিকারি ছিল না। খাদ্য-খাদক শৃঙ্খলের চূড়াতেও থাকত না তারা আর। বরং, নিজেরাই হয়ে উঠত শিকার। প্রায়শই রাতের অন্ধকারে কোনও হিংস্র জন্তুর হাতে শিকার হত তারা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৮
Share:

ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

আচমকা আলো নিবে গেলে, চার দিক অন্ধকার হলে গেলে মন অস্থির হয়ে ওঠে? ভয় ভয় লাগে? অন্ধকারে মনের এই উচাটন ভাব নতুন নয়, সেই আদিম কাল থেকেই মানুষের জিন এই উদ্বেগ বয়ে আনছে।

Advertisement

অন্ধকারকে ভয়ের একটি অন্যতম কারণ হল, কোনও দৃশ্যমানতা না থাকা। সামনে কোনও বিপদ থাকলে, বা কেউ হামলার চেষ্টা করলে, দিনের বেলায় তা সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু রাত? ঘুটঘুটে অন্ধকারে দু’হাত দূরে কোনও বিপদ অপেক্ষা করলেও তা ঠাহর হয় না চোখে। ফলে সেই অন্ধকারকে ঘিরে একটি ভয় স্বাভাবিক নিয়মেই রয়ে গিয়েছে এখনও।

দিন এবং রাত উভয়েই আমাদের কিছু না কিছু শিখিয়েছে। দিনের আলো যেমন দৃশ্যমানতা দিয়েছে, তেমনই রাতের অন্ধকার না থাকলে মহাবিশ্বের ধারণাই হয়ত তৈরি হত না মানুষের মনে। কিন্তু রাতের অন্ধকার কিছু নেতিবাচক প্রভাবও ফেলেছে মানুষের মধ্যে। তার মধ্যে একটি হল অন্ধকারের প্রতি ভয়। তবে এই ভয় আজকের নয়। যখন মানুষের মধ্যে যুক্তিবাদী চিন্তার আবির্ভাব হয়নি, তখন থেকেই এই ভয় রয়ে গিয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন গবেষণায় সেই তত্ত্বই উঠে এসেছে।

Advertisement

অন্ধকার হয়ে গেলে মানুষের মধ্যে এই শারীরিক উত্তেজনা কোনও অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য নয়। বরং এটি এমন এক ধরনের সহজাত প্রক্রিয়া যা কোনও বিপদের মুহূর্তে আত্মরক্ষার জন্য দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য শরীরকে সক্রিয় করে তোলে। বিজ্ঞানীরা এটিকে বলছেন, ‘সারভাইভাল সার্কিট’, যা প্রায় দশ লক্ষ বছর ধরে মানুষের মস্তিষ্কে গেঁথে রয়েছে।

সাধারণত অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার এই বৈশিষ্ট্য শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, এটি শিশুদের একটি বৈশিষ্ট্য, যা বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে কেটে যায়। কিন্তু বিষয়টি অনেকটাই আলাদা। ‘ফোর্ব্‌স’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এটি মানুষের যৌক্তিক ভয়ের অন্যতম পুরনো, যৌক্তিক ভয়ের প্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে একটি।

Advertisement

কেন আদিম কাল থেকে অন্ধকারের প্রতি এই ভয় রয়ে গিয়েছে মানুষের মনে? এর একটি আভাস পাওয়া যায় ২০০৫ সালে জীবাশ্মবিদ রবার্ট হার্ট এবং নৃতত্ববিদ রাসেল সাসম্যানের লেখা ‘ম্যান দ হান্ডেড’ বই থেকে। বস্তুত, মানব বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রায় বেশির ভাগ অংশ জুড়েই রাত ছিল ভয়ানক। হার্ট এবং সাসম্যানস সেই ‘ভয়ানক রাত’ তুলে ধরেছেন তাঁদের বইয়ে। দুই গবেষকের যুক্তি, আদিম কালে হোমোনিনেরা (আধুনিক মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্স এবং হোমো গণের অন্য মানব প্রজাতিগুলিকে একত্রে হোমোনিন বলে) সূর্যাস্তের পরে আর শিকারি ছিল না। অন্ধকার ঘনালে খাদ্য-খাদক শৃঙ্খলের চূড়ায় আর থাকত না তারা। বরং, নিজেরাই হয়ে উঠত শিকার। প্রায়শই রাতের অন্ধকারে কোনও হিংস্র জন্তুর হাতে শিকার হত তারা।

ওই আদিম কালে পৃথিবীতে শুধু আধুনিক মানুষের পূর্বসূরিরা থাকত না। পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত সিংহ, চিতাবাঘ, হায়েনার মতো হিংস্র জন্তুরাও, যারা ছিল মূলত নিশাচর শিকারী। রাতের অন্ধকারে মানুষ যেখানে ‘অন্ধ’, সেখানে অবাধ বিচরণ করত এই হিংস্র প্রাণীরা। অর্থাৎ, অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পরে পরিস্থিতি আর একরকম থাকত না। তখন পরিস্থিতি থাকত মারাত্মক ভাবে মানুষের প্রতিকূলে।

এর আগে ১৯৭১ সালে ‘সাইকোলজিক্যাল রিভিউ’ জার্নালে মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যানের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি জানান, নির্দিষ্ট কিছু ভয় অনেক সহজে অর্জন করার প্রবণতা থাকে মানুষের মধ্যে। যেমন— অন্ধকার, উচ্চতা, সাপ, মাকরসা ইত্যাদি থেকে ভয়। সেলিগম্যানের মতে, এই ভয়গুলি মানুষের মধ্যে তুলনামূলক দ্রুত প্রবেশ করে। প্রায়শই একটিমাত্র কোনও ভয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই এটি মানুষের মধ্যে ঢুকে যায়। শুধুমাত্র যুক্তির মাধ্যমে তা দূর করা বেশ কঠিন।

‘ফোর্ব্‌স’-এর ওই প্রতিবেদনে দুই আদিমানবের মধ্যে তুলনাও টানা হয়েছে। বলা হচ্ছে, যদি ধরে নেওয়া হয় তাদের মধ্যে এক জন অন্ধকার নামার পরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, আগুনের কাছে চলে যান, কোনও শব্দ শুনলে চমকে ওঠেন এবং অন্য জনের ক্ষেত্রে তেমনটা হয় না— তবে যে উদ্বিগ্ন হয়ে যেত, তারই বংশবৃদ্ধি করার মতো পর্যাপ্ত দিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেশি ছিল।

স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, এই ভীতিসঞ্চারের নেপথ্যে রয়েছে মস্তিষ্কের মধ্যে একটি ছোট বাদামের আকারের অংশ। নাম অ্যামিগডালা। কোনও বিপদসঙ্কেত দেখা দিলে, মস্তিষ্কের এই অংশটিই প্রথমে কাজ করে। এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অনেকটাই অসচেতন ভাবে হয়। কিন্তু যখন অন্ধকারে কোনও বিপদসঙ্কেত দেখা যায় না, তখন স্বয়ংক্রিয় ভাবেই ‘রক্ষণশীল’ ভূমিকায় থাকে অ্যামিগডালা। সে ধরে নেয়, হয়ত কোনও বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। বলা যেতে পারে, অন্ধকারের সময়ে অ্যামিগডালার অবস্থান এমন হয়ে যায়, যেন ‘সাবধানের মার নেই’। অতীতে ২০০১ সালে ‘মলিকিউলার সাইকায়াট্রি’ জার্নালে এ বিষয়ে একটি পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, সুস্পষ্ট কোনও বিপদসঙ্কতের চেয়ে বিপদের অস্পষ্ট কোনও সম্ভাবনার ক্ষেত্রেই অ্যামিগডালা বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ, বিপদের অস্পষ্ট সম্ভাবনার ক্ষেত্রে প্রকৃত বিপদকে শণাক্ত করা যায় না।

২০০০ সালেও ‘জার্নাল অফ ক্লিনিকাল চাইল্ড সাইকোলজি’ জার্নালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। বিভিন্ন বয়সের শিশুদের নিয়ে করা ওই গবেষণায় দেখা যায়, সব বয়সের শিশুদের মধ্যেই সবচেয়ে সাধারণ যে ভয়টি ছিল, তা হল— অন্ধকারের ভয়। গবেষণায় উঠে আসে, অন্ধকারের প্রতি এই ভয় বৃদ্ধি পেতে পেতে চার-ছয় বছর বয়সে তা সর্বোচ্চ পর্য়ায়ে পৌঁছোয়। তার পরে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এটি কোনও একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে নয়, সব জনগোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যেই এই ভয়ের প্রবণতা একই রকম থাকে।

বিজ্ঞানীদের মতে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই মিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে শিশু আফ্রিকার শিকারি প্রাণীদের নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র দেখেনি, যে রাতের অন্ধকার নিয়ে কোনও ভয়ের গল্প শোনেনি, তার মধ্যেও অন্ধকারের প্রতি এই একই ভীতি দেখা দিয়েছে। এই ভীতি যদি কোনও অর্জিত ভীতি (বাবা-মায়ের উদ্বেগ, ভয়ের গল্প থেকে তৈরি হওয়া ভীতি) হত, তবে ভিন্ন ভিন্ন সমাজে এই ভয়ের ব্যাপকতাও আলাদা হত। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, তেমনটা হয়নি। তা থেকেই বিজ্ঞানীদের দাবি, এই ভয় যতটা না অর্জিত, তার চেয়ে অনেক বেশি মানববিকাশের একটি অংশ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement