বিরোধী নয়, বাধ সাধছে ঘরের লড়াই

দুর্দিনে কে বন্ধু, আর কে শত্রু সেটাই বোঝা দায়! ভোটের আগে এমন ফাঁপরে পড়তে হবে সেটা কস্মিনকালেও ভাবতে পারেননি সুকুমার হাঁসদা।

Advertisement

কিংশুক গুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০১৬ ০০:৫৭
Share:

দলীয় কর্মিসভায় সুকুমার হাঁসদা, মঙ্গলবার ।

দুর্দিনে কে বন্ধু, আর কে শত্রু সেটাই বোঝা দায়! ভোটের আগে এমন ফাঁপরে পড়তে হবে সেটা কস্মিনকালেও ভাবতে পারেননি সুকুমার হাঁসদা।

Advertisement

ঝাড়গ্রামের বিধায়ককে এবারও দলীয় প্রার্থী করেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ঝাড়গ্রামে দলের অধিকাংশ কর্মী যেভাবে সুকুমারবাবুর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন, তাতে প্রবল অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে। সুকুমারবাবুর পাঁচ বছরের মন্ত্রিত্বকালে (প্রথমে পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতর। পরে আদিবাসী উন্নয়নমন্ত্রী) প্রকাশ্যে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলতে পারেনি। অথচ ভোটের মুখে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে পোস্টার সাঁটিয়ে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি করা হয়েছে। পোস্টারে সুকুমারবাবুর বিরুদ্ধে পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতরের টাকা কেলেঙ্কারির অভিযোগ তুলে তাঁকে ‘চোর-ডাকাত’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছে।

‘ঝাড়গ্রামবাসী’র নামে দেওয়া পোস্টারগুলি আদপে যে দলেরই কিছু লোকজন সাঁটিয়েছেন তা মন্ত্রী নিজেই কবুল করেছেন। তবে সুকুমারবাবুর ব্যাখ্যা, “সিপিএম ও কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া কিছু লোকজন আমাকে হেয় করার জন্য এই কুকর্ম করেছে। দলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নেই।”

Advertisement

দলীয় কর্মিসভায় সুকুমার হাঁসদা, মঙ্গলবার।

বাস্তব কিন্তু অন্য কথা বলছে। ২০১১ সালে বিধানসভা ভোটের সময় সুকুমারবাবুকে নিয়ে কর্মীদের মধ্যে বিপুল আবেগ ছিল। ঝাড়গ্রাম মহকুমা হাসপাতালের সরকারি চিকিত্‌সকের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সেই প্রথমবার ভোটে দাঁড়ান সুকুমারবাবু। তবে ঝাড়গ্রামের মতো অসংরক্ষিত আসনে আদিবাসী প্রার্থী দেওয়া নিয়ে গতবারও কর্মীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের চোরাস্রোত ছিল। তবুও নেতাই আবেগে প্রায় ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ের হাসি হেসেছিলেন সুকুমারবাবু। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই হাসি উধাও।

Advertisement

গত বার ঝাড়গ্রাম বিধানসভা আসনে ‘কিং মেকার’ ছিলেন তত্‌কালীন তৃণমূলের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক গৌরাঙ্গ প্রধান ওরফে গোরা। সুকুমারবাবু মন্ত্রী হওয়ার পরে তাঁর সঙ্গে মন কষাকষির জেরে দল থেকে বহিষ্কৃত হন গোরাবাবু। তৃণমূলের সর্বভারতীয় শ্রমিক নেতা তথা দলের ঝাড়গ্রাম সাংগঠনিক জেলা পর্যবেক্ষক প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গোরাবাবুকে সম্প্রতি পদ বিহীন দলে ফেরানো হলেও তিনি দূরে রয়েছেন।

ঝাড়গ্রাম বিধানসভা এলাকার মধ্যে রয়েছে লালগড় ব্লকের দশটি গ্রাম পঞ্চায়েত, ঝাড়গ্রাম ব্লকের চারটি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ঝাড়গ্রাম পুর-এলাকা। এর মধ্যে লালগড় ব্লক তৃণমূলের সভাপতি বনবিহারী রায় শুরু থেকেই সুকুমারবাবুর অনুগামী। কিন্তু বনবিহারীবাবুর পাল্টা গোষ্ঠীর নেতা তথা লালগড় ব্লক যুব তৃণমূলের সভাপতি তন্ময় রায়ের সঙ্গে কয়েকদিন আগে পর্যন্ত বাক্যালাপ বন্ধ ছিল সুকুমারবাবুর। যদিও এখন সুকুমারবাবুর বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছেন তন্ময়। কিন্তু তন্ময় গোষ্ঠীর অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়। ঝাড়গ্রাম শহর তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে সুকুমারবাবুর কোনও কালেই সুসম্পর্ক ছিল না। গত বিধানসভা ভোটে শহর তৃণমূলের একাংশ সুকুমারবাবুর হয়ে কাজ করেননি বলে
অভিযোগ উঠেছিল।

ক্ষমতার ভাগাভাগির প্রশ্নে ঝাড়গ্রাম জেলা তৃণমূলের কার্যকরী সভাপতি তথা পুরপ্রধান দুর্গেশ মল্লদেবের সঙ্গেও সুকুমারবাবুর দূরত্ব রয়েছে। দুর্গেশবাবুর অনুগামীদের আশা ছিল, এবার পুরপ্রধানকে ঝাড়গ্রাম আসনে প্রার্থী করবেন নেত্রী। প্রতিবার জঙ্গলমহলে এসে রাজবাড়ির অতিথিশালায় রাত্রিযাপন করেন মমতা। ফলে, রাজ পরিবারের উত্তরসূরি দুর্গেশবাবু অথবা তাঁর ভাই জয়দীপ মল্লদেবকে ঝাড়গ্রাম আসনে প্রার্থী করা হতে পারে বলে জোর জল্পনা ছিল। জঙ্গলমহলের রাজনীতিতে বরাবরই ঝাড়গ্রাম রাজ পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদর্থক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেই আশায় জল ঢালা হয়ে গিয়েছে। দলের একাংশের অভিযোগ, তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই টিকিট পেয়েছেন সুকুমারবাবু।

মঙ্গলবার সকালে ঝাড়গ্রাম শহরময় সুকুমারবাবুর বিরুদ্ধে পোস্টায়ে ছয়লাপ হয়ে যায়। এ দিন বিকেলে প্রচারের রণকৌশল স্থির করতে দেবেন্দ্রমোহন হলে কর্মিসভা ডেকেছিলেন সুকুমারবাবু। কিন্তু সেখানে লক্ষ্যণীয়ভাবে অনুপস্থিত ছিলেন ঝাড়গ্রাম জেলা তৃণমূলের সভাপতি চূড়ামণি মাহাতো ও জেলা কার্যকরী সভাপতি দুর্গেশ মল্লদেব। গরহাজির ছিলেন অনেকে। অনেকে ডাকই পাননি। তেমনই একজন ঝাড়গ্রাম ব্লক তৃণমূল সভাপতি অনিল মণ্ডল বলেন, “মন্ত্রী কিছু মুষ্টিমেয় লোকজনকে নিয়ে চলেন। দলের নিচুতলার সঙ্গে ওনার কোনও সম্পর্ক নেই। আমাকে ডাকেননি।”

কর্মিসভায় সুকুমারবাবুর অনুগামীরা অবশ্য ক্ষোভ-বিক্ষোভ ভুলে আদিবাসী উন্নয়নমন্ত্রীকে আরও বিপুল ভোটে জেতানোর আবেদন করেছেন। সুকুমারবাবু নিজে বলছেন, ‘‘সুকৌশলে আমাদের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। ৩৪ বছরের অনুন্নয়ন মাত্র ৫ বছরের উন্নয়ন দিয়ে ঢাকা সম্ভব নয়। ভুল-ভ্রান্তি-দ্বন্দ্ব সরিয়ে নেত্রীর প্রার্থীকে লক্ষাধিক মার্জিনে জেতানোর শপথ নিন।” বাস্তবিকই, প্রচারে নামার জন্য দলের অন্দরে একাধিক প্রতিপক্ষের সঙ্গেই লড়তে হচ্ছে সুকুমারবাবুকে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement