গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
পুবদিকে ভোটের ফল বেরোতেই তুলনায় চলে এল পশ্চিম সীমার পরিস্থিতি। পশ্চিমবঙ্গের দু’পাশেই ‘কট্টর মৌলবাদী শক্তি’ মাথাচাড়া দিচ্ছে— এমন ভাষ্য হাতিয়ার করে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছে বিজেপি।
বাংলাদেশের নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বিএনপি-র চেয়ারম্যান তথা সে দেশের হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের বার্তাও দিয়েছেন। কিন্তু তার পাশাপাশিই বিজেপি নেতারা তুলে ধরছেন পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত লাগোয়া এলাকার অধিকাংশ আসনে কট্টরবাদী দল জামায়াতে ইসলামীর (‘জামাত’ বলে পরিচিত) জয়ের ছবি। একইসঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে বিপরীত দিকে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ-বিহার সীমানার একগুচ্ছ আসনে আসাদুদ্দিন ওয়েইসির দল মিমের একচেটিয়া দাপটের ছবিও।
প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের কিষণগঞ্জ, কাটিহারের মতো জেলাগুলিতে মিমের রমরমা নতুন নয়। ২০২০ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও বিহারে ‘সীমাঞ্চল’ নামে পরিচিত ওই জেলাগুলিতে মিম ভাল ফল করেছিল। পাঁচটি বিধানসভা আসনে তারা জিতেছিল। ২০২৫ সালেও ‘সীমাঞ্চলে’ ফের একই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে ওয়েইসির দল। অনেকের মতে, ওয়েইসি প্রমাণ করেছেন, বিহারের ওই এলাকায় তাঁর দলের স্থায়ী জনভিত্তি তৈরি হয়ে গিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় জামাতের উত্থানকে বিহারের ‘সীমাঞ্চলে’র পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করল বিজেপি। এমনিতে উত্তর ২৪ পরগনা লাগোয়া বাংলাদেশের সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহের মতো এলাকা অনেক বছর ধরেই জামাতের শক্ত ঘাঁটি। মানচিত্রে মধ্যবঙ্গের সমান্তরালে অবস্থিত রাজশাহীতেও জামাতের প্রভাব বাড়ছিল। শুক্রবার প্রকাশিত বাংলাদেশ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সে প্রভাব বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত বরাবর বাংলাদেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত যত আসন, তার সিংহভাগেই জয়ী হয়েছে জামাতের জোট।
বিজেপির দাবি, পশ্চিমবঙ্গের এক পাশে জামাতের এই উত্থান এবং অন্য পাশে মিমের রমরমা ‘উদ্বেগজনক’। বিধানসভা ভোটের আগে তা নিয়ে ভাষ্য নির্মাণও শুরু হয়ে গিয়েছে। রাজ্য বিজেপির দাবি, দুই দিনাজপুর আর মালদহকে ঘিরে পরিস্থিতি সবচেয়ে ‘উদ্বেগজনক’। কারণ, বিহারে মিমের দাপট যে এলাকায় বেড়েছে, তা উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলা, ইসলামপুর, চোপড়া লাগোয়া। অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে ঝাড়খন্ডের যে অংশে দ্রুত জনবিন্যাস বদলাচ্ছে বলে বিজেপির দাবি, সেই অংশ মালদহ লাগোয়া। আর মানচিত্রে এর ঠিক উল্টো দিকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের যে অংশে জামাতের জনভিত্তি বেড়েছে, তা মালদহ, দক্ষিণ দিনাজপুর ও উত্তর দিনাজপুর লাগোয়া।
দক্ষিণ দিনাজপুর থেকে নির্বাচিত বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের দু’পাশেই কট্টর মৌলবাদী শক্তির উত্থান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির উত্থানের নানা কারণ রয়েছে। কিন্তু আমাদের পাশের রাজ্যে মিমের যে উত্থান, তার কারণ আরজেডি-র তোষণ নীতি। জাতীয় রাজনীতিতে যাঁরা আরজেডি-র জোটসঙ্গী, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ রাজ্যে একই নীতি নিয়েছেন। ফলে এখানেও কট্টর মৌলবাদী শক্তির উত্থানের আশঙ্কা রয়েছে।’’ সুকান্তের মতে, পশ্চিমবঙ্গের দু’পাশের এই পরিস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন কেন্দ্রীয় এজেন্সিরও এ রাজ্যে সক্রিয়তা বাড়ানো দরকার। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান ভূকৌশলগত ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।’’
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘আমরা চাইছি পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ জনতা এই পরিস্থিতি দেখুন এবং বিপদটা উপলব্ধি করুন। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আমরা এই পরিস্থিতির কথা রাজ্যবাসীর সামনে বিশদে তুলে ধরব।’’
বাংলাদেশ এবং বিহারের নির্বাচনী ফলাফলের এই বিশেষ চিত্রকে কি বিজেপি বিধানসভা ভোটের নির্বাচনী প্রচারের ভাষ্য করে তুলতে চাইছে? বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি এবং সমাজমাধ্যম শাখার সর্বভারতীয় প্রধান অমিত মালবীয়ের বক্তব্য, ‘‘বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের কাছে জেগে ওঠার বার্তা হওয়া উচিত। কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন সীমান্তের ও পার থেকে লাগাতার অনুপ্রবেশে উৎসাহ দিয়েছে এবং মদত জুগিয়েছে।’’ ঘটনাচক্রে, আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে মালবীয়ের কথোপকথনের পরে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির এক্স হ্যান্ডলেও সেই ভাষ্য পোস্ট করা হয়। সেখানে আরও লেখা হয়, ‘‘সাতক্ষীরা থেকে রংপুর পর্যন্ত যে এলাকা পশ্চিমবঙ্গ ও অসম লাগোয়া, সেখানে রাজনীতি বদলে গিয়েছে। বিএনপি বাংলাদেশে গরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও জামায়াতে সমর্থিত মৌলবাদী শক্তি ভারত লাগোয়া জেলাগুলিতে বিপুল জয় পেয়েছে।’’ এই পরিস্থিতিকে পশ্চিমবঙ্গবাসীর অবহেলা করা উচিত নয় বলেও বিজেপির পোস্টে লেখা হয়েছে। মালবীয় সেটি নিজের ‘এক্স’ হ্যান্ডলে শেয়ার করেছেন।