দোকানে ঝালমুড়ি বানাতে ব্যস্ত বিক্রম। নিজস্ব চিত্র।
ছিমছাম দোকান। থরে থরে সাজানো মুড়ি আর চানাচুরের প্যাকেট। দোকানের মালপত্র গোছাতে ব্যস্ত এক যুবক। গ্রাহক এসেছে দেখেই সেই কাজ ছেড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ঝালমুড়ি বানিয়ে দেব? বললাম, হ্যাঁ। তার পর স্টিলের একটি ডিব্বায় একে একে মুড়ি, চানাচুর, বাদাম এবং ঝালমুড়ির নানা মশলা দিয়ে বানানোয় মনোনিবেশ করলেন। ইনিই সেই ঝালমুড়িওয়ালা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর দোকান থেকেই ঝালমুড়ি খেয়েছিলেন। আর সেই ঘটনা রাতারাতি তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিল। ভোটপর্ব মিটেছে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু সেই ঘটনাপ্রবাহের রেশ এখনও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ঝাড়গ্রামে ঝালমুড়িওয়ালা বিক্রমকুমার সাউকে।
প্রসঙ্গত, গত ১৯ এপ্রিল ঝাড়গ্রামে ভোটপ্রচারে এসেছিলেন মোদী। সড়কপথে ফেরার সময় তাঁর কনভয় দাঁড়িয়েছিল ঝাড়গ্রাম শহরের রাজ কলেজ মোড়ের কাছে। ‘চবনলাল স্পেশ্যাল ঝালমুড়ি’ দোকান থেকে ১০ টাকার ঝালমুড়ি কিনে খেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আর সেই ঘটনার জেরে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন ঝাড়গ্রামের সেই ছাপোষা যুবক বিক্রম। কিন্তু সেই ঘটনাই এখন তাঁর জীবনকে ‘অতিষ্ঠ’ করে তুলেছে। এমনটাই জানালেন সেই যুবক। মুখে স্মিত হাসি থাকলেও চাপা একটা আতঙ্কের ছাপ লক্ষ করেছিলাম। বিক্রম নিজেও সেই আতঙ্কের কথা স্বীকার করেছেন।
ঝাড়গ্রামের কলেজ মোড়ে কুমুদকুমারী ইনস্টিটিউশনের কাছেই বিক্রমের ঝালমুড়ির দোকান। দোকানের সামনে এক পুলিশকর্মীকে বসে থাকতে দেখা গেল। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে, বিক্রমের নিরাপত্তার জন্য এই আয়োজন। শুধু পুলিশ নয়, পুলিশের তরফে দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরাও লাগিয়ে দিয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিক্রম এখন নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। দোকানে কিসের জন্য আসা, সব কিছু ওই পুলিশকর্মীকে জানিয়েই তবে বিক্রমের কাছে পৌঁছোনো যায়। কিন্তু হঠাৎ কেন এমন আয়োজন?
গত ১৯ এপ্রিল ঝাড়গ্রামে বিক্রমের দোকানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: সংগৃহীত।
বিক্রম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খেয়ে যাওয়ার পর থেকে নানা রকম হুমকি পাচ্ছেন। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে টেক্সট মেসেজ এবং হোয়াটস্অ্যাপে ধারাবাহিক ভাবে হুমকি পেয়েছেন তিনি। ঝাড়গ্রাম থানায় অভিযোগ করেছেন। তার পর থেকেই তাঁর নিরাপত্তার এই আয়োজন। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে দোকান। দোকান খোলা থেকে বন্ধ হওয়া পর্যন্ত পুলিশি নিরাপত্তা থাকে বিক্রমের দোকানে।
বিক্রমকে জিজ্ঞাসা করে জানা গিয়েছে যে, তাঁরা ২০ বছর ধরে এখানে আছেন। ব্যবসা করছেন। পরিবারে রয়েছেন বাবা, মা, স্ত্রী এবং পাঁচ বছরের ছেলে। দোকান থেকে মিনিট ১৫ দূরত্বে একটি ভাড়াবাড়িতে থাকেন। পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া। বিক্রমেরা আদতে বিহারের গয়ার বাসিন্দা। বিক্রম জানিয়েছেন, আগে ঠেলাগাড়িতে করে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। কিন্তু পাঁচ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে কলেজ মোড়ে দোকানটি কিনেছেন। তার পর থেকেই পাকাপাকি ভাবে এই দোকানে ঝালমুড়ি বিক্রি করছেন বিক্রম। বাবা-মা তাঁকে হাতে হাতে সাহায্যও করেন। বিক্রমের দাবি, এই ঘটনা তাঁর সঙ্গে না ঘটলেই ভাল হত। তাঁর কথায়, ‘‘মোদী যদি আমার দোকানে না আসতেন, তা হলে হয়তো এত সমস্যার মুখে পড়তে হত না।’’ প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকানে ঝালমুড়ি খেতে আসবেন, সেটা তিনি আগে থেকে কিছুই জানতেন না। হঠাৎ করে দোকানের সামনে এসে দাঁড়ান। তার পর ঝালমুড়ি দিতে বলেন বলে জানিয়েছেন বিক্রম। সেই ঘটনার পর থেকে ক্রমাগত হুমকি ফোন পাচ্ছেন। ফলে তাঁর গোটা পরিবার আতঙ্কে। নিরাপত্তার ব্যবস্থা হলেও স্বস্তিতে থাকতে পারছেন না ঝাড়গ্রামের এই ঝালমুড়ি বিক্রেতা। শুধু হুমকি ফোন-ই নয়, বিক্রম জানান, সেই ঘটনার পর থেকে তাঁর দোকান, এমনকি বাড়ির সামনে লোকজনের ভিড় লেগেই থাকে। তাঁর কথায়, ‘‘জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।’’
বিক্রম জানিয়েছেন, মোদীর দেওয়া সেই ১০ টাকা তিনি সযত্নে আলমারিতে রেখে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকানে এসে ঝালমুড়ি খেয়েছেন, তার পর থেকে তাঁর সঙ্গে যে সব ঘটনা ঘটছে, তা নিয়ে যথেষ্ট আতঙ্কিত বলেই দাবি বিক্রমের। পাশাপাশি ঝাড়গ্রামের ঝালমুড়িওয়ালা এটাও জানিয়েছেন, রাজ্যে সরকার যদি বদল না হত, তা হলে হয়তো এখান থেকে সব কিছু গুটিয়ে বিহারে চলে যেতে হত। কারণ, প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকানে ঝালমুড়ি খাওয়ার পর থেকে বিজেপির লোক বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে কোনও উত্তর দিতে চাননি বিক্রমের বাবা এবং মা। বিক্রম জানিয়েছেন, ১০ টাকার ঝালমুড়ি তাঁর জীবন বদলে দিলেও, আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বিক্রম যেখানে ভাড়া থাকেন, এক প্রতিবেশী রুনা ভকত জানিয়েছেন, সাউ পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন। খুবই ভাল পরিবার। ছেলে হিসাবে বিক্রমও যথেষ্ট ভাল। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকানে ঝালমুড়ি খাওয়ার পর থেকে পাড়ায় লোকজনের আনাগোনা বেড়েছে।