—প্রতীকী চিত্র।
‘চুপ করো, শব্দহীন হও।’
কিন্তু লাগামহীন শহরে এই আকুতি কেউ শুনছে কি? সদ্য শেষ হওয়া বছরে শহরের ‘সাইলেন্ট জ়োন’ ও ‘নো হর্ন জ়োনে’ শব্দতাণ্ডবের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিসংখ্যান দেখে তা অন্তত মনে হওয়ার উপায় নেই। যা প্রশ্ন তুলছে, ‘সাইলেন্ট জ়োনে’ শব্দের দাপট জব্দ হবে কবে? কবে হুঁশ ফিরবে সাধারণ মানুষের?
কলকাতা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ‘নো হর্ন জ়োনে’ বিধি ভাঙার পরিসংখ্যান কার্যত লাগাম ছাড়িয়েছে। গোটা ডিসেম্বর মাস জুড়ে কলকাতা পুলিশ এলাকায় ৯৫৫টিমামলা রুজু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান যে তার আগের কয়েক মাসের তুলনায় বেশি, তা মানছে পুলিশেরই একাংশ।
হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালত চত্বরকে সাধারণত ‘সাইলেন্ট জ়োন’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এ ছাড়া, বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবনকেও এর আওতায় রাখা হয়। ‘সাইলেন্ট জ়োনে’ শব্দের মাত্রা দিনে ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেলের বেশি হলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। এর পাশাপাশি যে সব এলাকায় কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে— সেই সব এলাকা ‘নো হর্ন জ়োন’ হিসাবে চিহ্নিত। কলকাতা পুলিশ এলাকায় প্রায় ৫০টি এমন জায়গা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার ১০০ মিটারের মধ্যে শব্দবিধি না মানলে পুলিশ ‘মোটর ভেহিক্ল আইন’ অনুযায়ী মামলার পাশাপাশি জরিমানাও করতে পারে। সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা এবং ক্ষেত্র বিশেষে ২০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে এই ক্ষেত্রে।
কেন ‘নিঃশব্দ এলাকা’য় এত শব্দের দাপট? পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সচেতনতামূলক প্রচারের অভাব এবং শহরের রাস্তায়ট্র্যাফিকের ঘনত্বকে দায়ী করছেন। পরিবেশকর্মী নব দত্ত বলছেন, ‘‘আমাদের শহরে যিনি বা যাঁরা অকারণে হর্ন বাজাতে পারদর্শী, তাঁরাই ভিন্ দেশে গেলে বদলে যান। এর কারণ পুলিশি কড়াকড়ি আর সচেতনতা। শব্দবাজি বা ডিজে-র বিরুদ্ধে প্রচার চললেও অকারণে হর্ন বাজানো বন্ধে বা ‘নো হর্ন জ়োন’-এ নিয়ম মেনে চলা নিয়ে কিছুই সে ভাবে চোখে পড়ে না।’’
এই বেপরোয়া হওয়ার ফল যে কত মারাত্মক হতে পারে, তা বোঝাতে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, শব্দের তাণ্ডবে শহরে ইদানীং শ্রবণ সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার প্রবণতা বেড়েছে। মূলত কমবয়সিদের মধ্যে এমন সমস্যা দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ কানে শোঁ শোঁ আওয়াজ, কানে ব্যথা, শ্রবণক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো একাধিক সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসছেন অনেকে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের কাছে এই শব্দের দৌরাত্ম্য আরও ক্ষতিকর। নাক-কান-গলার চিকিৎসক অরুণাভ সেনগুপ্ত বলছেন, ‘‘শব্দের তাণ্ডব প্রতিদিন একটু একটুকরে ক্ষতি করে। কমবয়সিরাও এখন আক্রান্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা বার বার সচেতন করছি। কিন্তু কে শুনছে?’’
লালবাজারের যদিও দাবি, শহরের ‘সাইলেন্ট জ়োনে’ শব্দের তাণ্ডব আটকাতে প্রতিদিন তিনটি দল কাজ করে। গড়ে ২০-২৫টি মামলা রুজু করা হয়। কিন্তু, বিধি ভাঙার বহরের সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার এই সংখ্যা কি আদৌ সমার্থক? লালবাজারের ট্র্যাফিক বিভাগের এক কর্তা বলছেন, ‘‘এই বিধি ভাঙা আটকাতে প্রতিদিন একাধিক দল কাজ করে। আইন ভাঙলে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।’’ কিন্তু সেই ব্যবস্থা আদৌ পর্যাপ্ত কিনা, তার উত্তর মেলেনি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে