উদ্ধারকারী তিন যুবক। — নিজস্ব চিত্র
মাঝরাতে রাস্তায় দশ-বারোটা কুকুরের হাঁকাহাঁকি নজর কেড়েছিল চার বন্ধুর। রাতে কুকুরদের এমন দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো অস্বাভাবিক নয় ভেবে গাড়ি নিয়ে পাশ কাটিয়ে এগিয়েও গিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু বিজয়গড় থেকে রানিকুঠি যাওয়ার ওই রাস্তায় হঠাৎ, কুকুরের ডাকের সঙ্গে বাচ্চার কান্নার শব্দ ভেসে আসে। তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে যান ওঁরা।
গিয়ে দেখেন, একটা বস্তার মতো জিনিস নিয়ে কুকুরগুলো কামড়াকামড়ি, টানাটানি করছে। সেখান থেকেই কান্নার আওয়াজ আসছে। দশ-বারোটা কুকুরকে ততটা পরোয়া না করেই এ বার বস্তাটির দিকে আরও একটু এগোন তাঁরা। তাঁরা অর্থাৎ, এমবিএ-পাঠ্যক্রমের চার ছাত্র। রাজদীপ ভাণ্ডারী, সৌরভ বসু, সৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় এবং সায়ন দেবনাথ।
রাজদীপ জানান, গত মঙ্গলবার রাতে রাস্তাটা তখন একদম ফাঁকা। রাস্তার আলোয় ওঁরা দেখেন, বস্তা থেকে একটা ছোট্ট বাচ্চার দেহের অর্ধেকটা বেরিয়ে। হাতে, গালে, বুকে ততক্ষণে কুকুরের পাল আঁচড়ে-কামড়ে দিয়েছে।
সৌভিক বলেন, ‘‘বাচ্চাটি কাঁদতে-কাঁদতে হেঁচকি তুলছিল, মাঝে মাঝে ওর গলা বন্ধ হয়ে আসছিল। হাতে রূপোর বালা পরানো, কপালে কাজলের টিপ। কেউ বাচ্চাকে সাজিয়েগুছিয়ে মরার জন্য রাস্তায় ফেলে দিয়ে যেতে পারেন!’’
তাঁরা বস্তা থেকে বাচ্চাটিকে বার করে কোলে নেওয়ার পরেও কুকুরগুলো ওঁদের ঘিরে গরগর করছিল, যেতে দিচ্ছিল না। তখন ওঁরা গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে একটা র়ড নিয়ে তাদের তাড়ান। সায়নদের বক্তব্য, এ ভাবে আর কিছুক্ষণ থাকলে কুকুরগুলো ওকে
ছিঁড়ে খেত।
এরই মধ্যে এক জন ১০০ ডায়াল করেন, ভাগ্যক্রমে তাতে সাড়াও মেলে। পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে জানানো হয় যে লোক পাঠানো হচ্ছে। সৌভিকের কথায়, ‘‘পনেরো-কুড়ি মিনিট বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করার পরে আমাদের মনে হয়, হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরি হলে বাচ্চাটার কোনও ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের মধ্যে এক জন গাড়ি নিয়ে গল্ফগ্রিন টিভি টাওয়ারের দিকে যান। সেখানে পুলিশের একটা মোবাইল ভ্যান মেলে। তাদের সব জানালে তারা যাদবপুর থানায় খবর দেন।
পুলিশের সঙ্গে চার যুবক এর পরে বাচ্চাটিকে নিয়ে বাঙুর হাসপাতালে যান। সেখানে ইমার্জেন্সিতে থাকা তরুণ চিকিৎসক নিশান্ত সাহা-ও যথাসাধ্য সাহায্য করেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ‘‘গত তিন দিন নিয়ম করে ওই চার ‘দাদা’ তাদের কুড়িয়ে পাওয়া ভাইটিকে হাসপাতালে দেখতে আসছেন।’’ বাঙুর হাসপাতালের সুপার অনুরাধা দেব জানিয়েছেন, শিশুটির পায়ের পাতা দু’টি জন্ম থেকে বাঁকা। সম্ভবত এই দৈহিক প্রতিবন্ধকতার কারণেই বাড়ির লোক তাকে ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, চিকিৎসায় পা সেরে যাবে। ‘রাষ্ট্রীয় বাল সুরক্ষা কার্যক্রম’-এর টাকায় ওই শিশুটির চিকিৎসা হবে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর। আপাতত কুকুরের আক্রমণে হওয়া ক্ষত আর ডায়রিয়ার চিকিৎসা চলছে। এ দিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাত-পা ছুঁড়ে খেলছে ছোট্ট শিশুটি।