চিন্তিত: অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা (ডান দিকে) ও অন্য পরিজনেরা। রবিবার, কালিন্দীর জপুরের বাড়িতে। ছবি: রণজিৎ নন্দী।
মৃত্যুর পরে তিন দিন পেরিয়ে গিয়েছে। একতলার ছোট্ট ফ্ল্যাটে প্রতিবেশীদের যাতায়াত এখনও কমেনি। সকাল হলেই পাড়ার আপাত শান্ত গলিটা চেনা-অচেনা মুখের ভিড়ে ভর্তি। গলি পেরিয়ে ফ্ল্যাটের ঘরেও একই অবস্থা। সেখানেও বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-পরিজন। তাঁদের কেউই যদিও কথা বলার মতো মানসিকতায় নেই। কিছু জানতে চাইলেই শুধু উত্তর মিলছে, ‘‘বলে আর কী হবে? ছেলেটা তো আর ফিরবে না।’’
শনিবার রাতে ই এম বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কালিন্দীর জপুরের বাড়িতে ফিরেছেন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী সোনালি এবং ছেলে আরুষ। এখনও ভয়াবহ ওই রাতের আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি সোনালি। কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই তিনি। অন্য দিকে, বাবা যে আর ফিরবে না, এখনও সে সব কিছু বুঝেই উঠতে পারেনি তিন বছরের শিশুটি।
ঘটনার রাতে আহত হয়েছিলেন সোনালি এবং আরুষও। অরূপের মৃত্যুর পরে কেউ আর হাসপাতালের উপরে ভরসা করেননি। ভোরেই শিশুটিকে ছুটি করিয়ে কালিন্দীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। পরে মা-ছেলেকে ভর্তি করানো হয় ই এম বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে।
পাড়ায় ডাকাবুকো ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে বুঁচু। প্রতিবেশীর বিপদে রাতেও আর জি করে দৌড়ে যেতে দ্বিধা করতেন না। এ হেন অরূপের সেই হাসপাতালেই যে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু হবে, এটা কারও বিশ্বাস হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনার ঘোর পরিবার তো দূর, প্রতিবেশীরাই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। পাড়ার মোড়ে বসে ছিলেন কয়েক জন প্রৌঢ়। তাঁদেরই এক জন বললেন, ‘‘প্রাণে বাঁচতে যেখানে হাসপাতালে যায়, সেখানে গিয়ে এ ভাবে মৃত্যু, কী ভাবে বিশ্বাস করব!’’
করুণ অবস্থা অরূপের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের। কী ভাবে বৌমা ও ছোট্ট নাতিকে সামলাবেন, এই চিন্তাতেই কার্যত ঘুম উড়েছে বৃদ্ধ দম্পতির। বাড়িতে বসেই অরূপের বাবা অমল বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘‘ছেলের পারলৌকিক কাজ শুরু হয়েছে। এখন তো বাড়ি ভর্তি লোকজন। সকলেই ওদের সামলে নিচ্ছেন। কিন্তু এর পরে? ছোট্ট নাতিটাকে আমি কী জবাব দেব? ওর মুখের দিকে আমি কী ভাবে তাকাব? ’’ কথা শেষ না করে চোখের জল মুছে নিয়ে বলতে শুরু করেন বৃদ্ধ, ‘‘জানি না, আমি আর কত দিন বাঁচব। তবে এই বয়সে এসে আমার দায়িত্ব অনেকটা বেড়ে গেল। যত দিন না ওর মায়ের কাজের কিছু ব্যবস্থা হচ্ছে, বাচ্চাটাকে তো দেখতে হবে।’’
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলেও সে রাতের ভয়াবহতার ‘চিহ্ন’ তিন বছরের আরুষের শরীর থেকে এখনও মিলিয়ে যায়নি। চোখের তলায় কালশিটে এখনও স্পষ্ট। চশমা পরেও তা লুকোচ্ছে না। আঘাতের চিহ্ন রয়ে গিয়েছে ছোট্ট পায়েও। অস্ত্রোপচার হওয়া ডান হাত জুড়ে ব্যান্ডেজ করা। যদিও সেই ক্ষত নিয়েই ফ্ল্যাটের এ ঘর থেকে ও ঘরে দৌড়ঝাঁপ করে চলেছে সেই শিশু। সুযোগ পেলেই টিভির রিমোট কেড়ে নিয়ে কার্টুন চ্যানেলে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।
বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলেই কোনও দিকে না তাকিয়ে অকপট সারল্যে উত্তর দিচ্ছে, ‘‘বাবা গর্তে পড়ে গিয়েছে। ওখান থেকেই উঠেই বাড়িতে চলে আসবে।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে