রাত তখন সাড়ে ন’টা-দশটা। নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের ভিতরে ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানে কয়েকজন মাত্র দাঁড়িয়ে। বাইরে রাস্তার পাশে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীর পরিজনেরা। হঠাৎই গোলমালের শব্দে চমকে উঠলেন তাঁরা। দেখলেন কিছুটা দূরেই এক যুবককে ঘিরে ধরে প্রচন্ড মারছে কয়েকজন যুবক। মারতে মারতে দেওয়ালে আছড়ে ফেলছে ওই যুবককে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্তাক্ত অবস্থায় নেতিয়ে পড়লেন ওই যুবক। তাকে ফেলে চম্পট দিল বাকিরা।
২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে এনআরএসের হস্টেলের ভিতরে জুনিয়র চিকিৎসকদের মারে মৃত্যু হয়েছিল প্রতিবন্ধী যুবক কোরপান শাহের। সেই ঘটনার এক বছর কাটতে না কাটতেই বুধবার রাতে চুরির প্রতিবাদ করতে গিয়ে এভাবেই খুন হলেন এনআরএসের গ্রুপ ডি স্টাফ কোয়ার্টারের বাসিন্দা শঙ্কর মাঝি(২৬)। এবার কাঠগড়ায় স্টাফ কোয়ার্টারেরই কয়েকজন বাসিন্দা।
কী হয়েছিল বুধবার রাতে?
প্রত্যক্ষদর্শী এবং পরিবারের লোকেরা জানাচ্ছেন, চুরির প্রতিবাদ করতে গিয়েই আক্রান্ত হয়েছেন শঙ্কর। তাঁরা জানাচ্ছেন, শঙ্করের ন’মাস বয়সী ছেলে রাজবি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালেই ভর্তি ছিল। তার জন্য ওষুধ কিনতে এসেছিলেন তিনি। ওষুধ কিনে পরিচিত একজনের হাতে দিয়ে তিনি বাড়ির দিকে আসছিলেন। সেইসময় রাস্তায় পড়েছিলেন এক মদ্যপ ব্যক্তি। শঙ্কর দেখেন, স্টাফ কোয়ার্টারের কয়েকজন যুবক এবং কিছু বহিরাগত ওই ব্যক্তির পকেট থেকে টাকা এবং মোবাইল ফোন বের করে নিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদ করেন তিনি। প্রতিবাদ করতেই শঙ্করকে ঘিরে ধরে ওই যুবকেরা। প্রথমে তাঁর কাছ থেকেও টাকা এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তারপরই ওই যুবকেরা তাঁকে মারতে শুরু করে বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মার খেতে খেতে শঙ্কর নেতিয়ে পড়লে তাঁকে ফেলেই চম্পট দেয় ওই যুবকেরা।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছন বাড়ির লোকেরা। তাঁকে উদ্ধার করে এনআরএসের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় শঙ্করের পরিজনেরা অভিযোগের আঙুল তুলেছেন কোয়ার্টারের দুই বাসিন্দা পাপ্পু এবং অশোকের দিকে। মৃত শঙ্কর মাঝির বোন সঙ্গীতাদেবীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই পাপ্পু এবং অশোকের নেতৃত্বে কোয়ার্টারের কিছু ছেলে অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়েছে। চুরি-ছিনতাই করে নেশা করা তাদের প্রধান কাজ। মাঝেমাঝেই বাইরে থেকে আসা কিছু যুবকও তাদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিত। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও অভিযোগ, পাপ্পু,অশোক এবং তাদের দলবল মহিলাদের উত্যক্ত করতেও ছাড়ত না। প্রতিবাদ করতে গেলে মারধরের হুমকি দিত। রীতিমতো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিলেন কোয়ার্টারের বাসিন্দারা। পুলিশকে জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি।
শঙ্করের মৃত্যুতে এদিন শোকের ছায়া কোয়ার্টারের ‘বি’ ব্লকে। কোলে ন’মাসের শিশুকে নিয়ে থেকে থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন শঙ্করের স্ত্রী সনি মাঝি। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বাবা রাজকুমার মাঝি। রাজকুমারবাবু এনআরএসের প্রসূতি বিভাগের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তিনি বলছেন, ‘‘ছেলেটা চুরির প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হয়ে গেল! ও যখন মার খাচ্ছিল অনেকেই তো ছড়িয়েছিটিয়ে ছিল রাস্তায়। কেউ যদি বাধা দিত তাহলে হয়ত ছেলেটা বেঁচে যেত।’’
এই ঘটনায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ প্রতিবেশীরাও। তাঁদের দাবি, যারা এই ঘটনায় যুক্ত তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। তাঁরা বলেন, ‘‘চুরির প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন মেনে নেওয়া যায় না। দোষীরা শাস্তি না পেলে কেউ তো প্রতিবাদ করার সাহস পাবে না।’’
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকেই পাপ্পু এবং অশোক ফেরার। ডেপুটি কমিশনার (ইএসডি) দেবজ্যোতি দে বলেন, ‘‘প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে স্থানীয় গোলমালের জেরেই ঘটনাটি ঘটেছে। পুলিশ সবটা খতিয়ে দেখছে। তল্লাশি চলছে।’’
এই ঘটনার নিন্দা করে এনআরএসের অধ্যক্ষ দেবাশিস ভট্টাচার্য্য জানান, হাসপাতালের মধ্যে এই ধরনের গোলমাল কখনই বরদাস্ত করা হবে না। তিনি বলেন, ‘‘মানুষের অমানবিক মুখটা বড় বেশি করেই সামনে চলে আসছে। ঘটনাটা কোথায় ঘটছে সেটা বড় কথা নয়, কথা হল, সেখানে যাঁরা ছিলেন তাঁরা কেউ বাধা দেননি। বাধা দিলে হয়ত ছেলেটা বেঁচে যেত। আমরাও সবটা খতিয়ে দেখছি।’’